স্পর্শিয়া মিম
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই এক ঐতিহাসিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৬ সালে এসে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই গণতন্ত্র পা রাখল তার ২৫০তম বছরে।
কোয়ার্টার-মিলেনিয়াল বা এই ২৫০ বছর পূর্তি হওয়ার কথা ছিল গোটা আমেরিকার একতার, ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় উদযাপনের এবং ভবিষ্যতের দিকে এক হয়ে এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই মহিমান্বিত আয়োজন রূপ নিয়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন এবং এটিকে একটি ‘উদ্ভট নাট্যমঞ্চে’ (Theatre of the Absurd) পরিণত করেছেন।
উদযাপনের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক হাতিয়ার
যেকোনো দেশের ২৫০ বছরের ইতিহাস এক বিশাল মাইলফলক। কিন্তু আমেরিকার এই ঐতিহাসিক ক্ষণটি এখন আর কেবল জাতীয় গৌরবের জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। অভিযোগ উঠছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনকে সম্পূর্ণ নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা ও ব্যক্তি-কেন্দ্রিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে কুক্ষিগত করেছেন।
যেখানে ওয়াশিংটন ডিসি বা ফিলাডেলফিয়ার মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলো কেন্দ্র করে দলমত নির্বিশেষে সবার এক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ট্রাম্পের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও তার অনুসারীদের আধিপত্য এই আয়োজনকে একপেশে করে তুলেছে। ফলে এটি একটি জাতীয় উৎসবের চেয়ে বেশি ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তির মহড়া হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে।
কেন ‘উদ্ভট নাট্যমঞ্চ’ ?
সাহিত্যের পরিভাষায় ‘থিয়েটার অব দ্য অ্যাবসার্ড’ বা ‘উদ্ভট নাট্যমঞ্চ’ বলতে এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে যুক্তি, বাস্তবতা এবং স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায়; ভর করে কেবলই অসংলগ্নতা আর অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ড। আমেরিকার ২৫০তম বার্ষিকীতে ঠিক এই আবহটিই তৈরি হয়েছে কয়েকটি কারণে:
ইতিহাসের চেয়ে ব্যক্তির বড় হয়ে ওঠা: যেখানে জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন কিংবা আব্রাহাম লিংকনের আদর্শকে স্মরণ করার কথা, সেখানে পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা হয়েছে ট্রাম্পের নিজস্ব ভাবমূর্তিকে। ইতিহাসের মূল সুর যেন এখানে গৌণ।
বিভাজনের রাজনীতি: স্বাধীনতা দিবস মানেই যেখানে ঐক্যের ডাক, সেখানে এই উদযাপনকে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে আক্রমণ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও উসকে দেওয়া হচ্ছে। ফলে উৎসবের আনন্দ রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক তিক্ততায়।
বাস্তবতাবর্জিত আড়ম্বর: অতি-নাটকীয়তা, বিশাল সব রাজনৈতিক স্লোগান আর পপুলিস্ট বক্তৃতার আড়ালে আমেরিকার বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে এক প্রকার আড়াল করার চেষ্টা চলছে। এই অসংলগ্নতাই পুরো আয়োজনকে একটি থিয়েটারের রূপ দিয়েছে।
একটি ঐতিহাসিক সুযোগের অপচয়?
আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী হতে পারত বিশ্বমঞ্চে দেশটির গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে পুনরায় তুলে ধরার এক অনন্য সুযোগ। বর্ণবাদ, রাজনৈতিক বিভেদ আর অর্থনৈতিক বৈষম্যের ধাক্কায় জর্জরিত আমেরিকার জন্য এটি হতে পারত এক ক্ষত নিরাময়ের উপলক্ষ।
কিন্তু ট্রাম্পের এই একক নিয়ন্ত্রণ এবং পুরো বিষয়টিকে একটি রাজনৈতিক ‘শো’ বা নাট্যমঞ্চে রূপান্তর করার ফলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশই এই উদযাপন থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন বোধ করছেন।
একটি দেশের ২৫০ বছরের ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা দলের চেয়ে অনেক বড়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অতি-রাজনীতিকরণ সাময়িকভাবে হয়তো তার সমর্থকদের উল্লাস জোগাচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আমেরিকার জাতীয় সংহতি ও ইতিহাসের গাম্ভীর্যকে ক্ষুণ্ন করছে। ইতিহাস মনে রাখে ত্যাগ, আদর্শ আর সাম্যকে— কোনো সাময়িক রাজনৈতিক নাটকের জমকালো মঞ্চকে নয়। আমেরিকার এই ২৫০তম বছরের ‘উদ্ভট নাট্যমঞ্চ’ তাই কেবলই এক নেতার ক্ষমতার প্রদর্শন নাকি মার্কিন গণতন্ত্রের এক গভীর সংকটের প্রতীক, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
Comments are closed.