The news is by your side.

মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পভুবন

বিশেষ সম্পাদকীয়

39

সুজন হালদার

মুস্তাফা মনোয়ার। কেবল ক্যানভাসে রঙ-তুলির আঁচড়েই নয়, বরং মৃতপ্রায় লোকশিল্পকে আধুনিক রূপ দিয়ে এবং পুতুলের প্রাণহীন অবয়বে জাদুকরী প্রাণসঞ্চার করে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। তাকে অবলীলায় আখ্যায়িত করা যায় বাংলাদেশের ‘পুতুলনাচের জাদুকর’ এবং ‘রঙের কবি’ হিসেবে।

১৯৩৫ সালে ঝিনাইদহে জন্ম নেওয়া এই গুণী শিল্পী শৈশব থেকেই সংস্কৃতির এক উর্বর আবহে বেড়ে উঠেছেন। কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ থেকে চারুকলায় স্বর্ণপদকসহ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে তিনি তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার জানান দেন। জলরং মাধ্যমে মুস্তাফা মনোয়ারের দক্ষতা অসাধারণ। তাঁর ক্যানভাসে বাংলাদেশের চিরচেনা প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, নদী এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের গল্পগুলো এক মায়াবী আলো-ছায়ার খেলায় মূর্ত হয়ে ওঠে। রঙের পরিমিত ও সংবেদনশীল ব্যবহার তাঁর চিত্রকর্মগুলোকে এক শান্ত ও গভীর দ্যোতনা দেয়।

শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার এর সঙ্গে ভিশন নিউজ ২৪.কম  সম্পাদক সুজন হালদার  ( ছবিটি ২০২২ সালে তোলা )

মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পকর্মের এক বিশাল ও অবিচ্ছেদ্য অংশ জুড়ে রয়েছে পুতুলনাট্য বা পাপেট্রি। বাংলাদেশে আধুনিক পাপেটের জনক বলা হয় তাঁকে। লোকজ ঐতিহ্যকে ধারণ করে তিনি যেভাবে পাপেটকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর।

তাঁর পাপেট কেবল শিশুদের বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং তার গভীরে থাকত সূক্ষ্ম সামাজিক বার্তা ও শিক্ষণীয় উপাদান।

তিনি বিশ্বাস করেন, শুষ্ক উপদেশের চেয়ে আনন্দের ছলে পুতুলের মাধ্যমে শিশুকে যা শেখানো যায়, তা মনের গভীরে দাগ কেটে যায়।

তাঁর হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে ‘পারুল’-এর মতো জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র, যা এক প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে রেখেছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) শুরুর দিনগুলোতে এর নান্দনিক উন্নয়নে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান ছিল অপরিসীম। টেলিভিশনের মতো একটি যান্ত্রিক মাধ্যমকে তিনি পাপেট, নাটক ও নান্দনিক সেট ডিজাইনের মাধ্যমে শিল্প রূপ দিয়েছিলেন।

বিটিভিতে প্রচারিত তাঁর বিখ্যাত শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। পাপেট ‘বাঘা’ ও ‘শেয়াল’-এর কথপোকথনের মাধ্যমে তিনি শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও সমাজ সচেতনতাকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পচেতনা এক ভিন্ন রূপ নেয়। শরণার্থী শিবিরে গিয়ে তিনি পুতুলনাচ দেখিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত, আতঙ্কিত শিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন এবং তাদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিলেন। শিল্পের যে একটি মানবিক ও নিরাময়কারী গুণ আছে, এটি ছিল তাঁর অন্যতম বড় প্রমাণ।

শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য এই গুণী শিল্পী ‘একুশে পদক’ (২০০৪)-এ ভূষিত হন। এছাড়াও দেশ-বিদেশ থেকে তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।

“শিল্পের কাজ মানুষকে আনন্দ দেওয়া, আর সেই আনন্দের ভেতর দিয়ে তাকে সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।” — এই জীবনদর্শনকেই আজীবন লালন করেছেন মুস্তাফা মনোয়ার।

মুস্তাফা মনোয়ার এমন একজন শিল্পী, যিনি শিল্পকে ড্রয়িংরুমের চার দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের খুব কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। তাঁর ক্যানভাসের রঙ যেমন জীবন্ত, তাঁর হাতের পুতুলগুলোও তেমনি বাঙ্ময়। বর্তমান যান্ত্রিক যুগে দাঁড়িয়ে তাঁর সৃষ্টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা, আমাদের সহজ-সরল বাঙালি সংস্কৃতির কথা। তিনি বাংলাদেশের শিল্পকলার আকাশে এক চিরভাস্বর নক্ষত্র।

 

Comments are closed.