The news is by your side.

প্যারিসে ‘হিটওয়েভ মোড’ : ২৪ ঘণ্টা পার্ক খোলা রাখা এবং মদ নিষিদ্ধ

10

হেলেন ম্যাসি,  প্যারিস

গত সপ্তাহান্তে, প্যারিসের অন্যতম জনপ্রিয় সবুজ প্রাঙ্গণ- ‘পার্ক দে ব্যুত-শমোঁ’ (Parc des Buttes-Chaumont)-এ যখন সন্ধ্যা নেমে আসছিল, তখন ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ (Fête de la musique)-এর আনন্দময় ও জমজমাট আয়োজন শুরু হয়। এটি মূলত সব ধরনের সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে গ্রীষ্মকালীন অয়নকাল (summer solstice) উদযাপনের একটি উৎসব। এর অংশ হিসেবে কাছাকাছি ক্যাফেগুলোতে প্রতিযোগী ডিজেরা তাদের সেট বাজানো শুরু করেছিলেন।

চারপাশ ছিল দমবন্ধ করা গরম, আর বনভোজনকারীরা পানি, জুস কিংবা অ্যালকোহলমুক্ত বিয়ার খেয়ে শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করছিল। উৎসব চলাকালীন প্যারিস কর্তৃপক্ষ পাবলিক প্লেসগুলোতে (ক্যাফের বারান্দা বা টেরেস বাদে) মদ্যপান নিষিদ্ধ করে। শহরটি যখন ‘ভিজিল্যান্স রেজ ক্যানিকুল’ (vigilance rouge canicule) অর্থাৎ লাল সতর্কতার চরম তাপদাহের স্তরে পৌঁছায়, তখন নাগরিকদের নিরাপদ রাখতে তারা যেসকল পদক্ষেপ নিতে পারে, এটি ছিল তারই একটি।

এই তাপদাহটি দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র হতে চলেছে—মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশটির ৯৬টি বিভাগের মধ্যে ৫৪টি বিভাগেই লাল সতর্কতা জারি ছিল। এছাড়া জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর ‘মেতেও ফ্রান্স’ (Météo France) নিশ্চিত করেছে যে, ১৯৪৭ সালে রেকর্ড শুরু হওয়ার পর থেকে ফ্রান্স তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত দিনটি পার করছে। এমনকি এটি বছরের প্রথম তাপদাহও নয়। তাপদাহের ঝুঁকি নিরূপণ ও শ্রেণিবিন্যাস করা এবং উচ্চ তাপমাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ফ্রন্সের এই সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিটি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে, কারণ তারাও প্রতিনিয়ত তীব্র তাপদাহের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

প্যারিসে তীব্র তাপদাহ ও গৃহীত পদক্ষেপসমূহ

প্যারিসের বাসিন্দারা তীব্র গরম থেকে বাঁচতে নিজেদের মতো করে নানা উপায় খুঁজে নিচ্ছেন। প্রখর সূর্যের আলো থেকে বাঁচতে মেটালের তৈরি জানালার সাটার বা পর্দাগুলো নিচে নামিয়ে, অন্তত রাত ১০টা পর্যন্ত জানালাগুলো বন্ধ রাখার ফলে আমার অ্যাপার্টমেন্ট থাকার উপযোগী রয়েছে, যদিও এভাবে জীবনযাপন করা মোটেও আরামদায়ক বা আনন্দের কিছু নয়।

রাস্তার ঠিক অপর পাশে, ছাদের ঠিক নিচের তলার (কার্নিশের নিচে) একজন বাসিন্দা স্পষ্টতই আমার মতো এতটা সৌভাগ্যবান নন—তিনি তীব্র তাপকে ঘরের বাইরে রাখার চেষ্টায় তার জানালায় একটি প্রতিফলক সারভাইভাল ব্ল্যাঙ্কেট বা তাপ-প্রতিরোধক চাদর টেপ দিয়ে আটকে দিয়েছেন।

তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস থাকায়, তাপদাহে বিপর্যস্ত প্যারিসবাসীদের সাহায্য করতে প্যারিস কর্তৃপক্ষ আরও কিছু যৌথ ও সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

মদ্যপান নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি, পার্কগুলো ২৪ ঘণ্টাই খোলা রাখা হবে যাতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলে মানুষ সেখানে গিয়ে ফ্রেশ বাতাস পেতে পারে। এছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সরকারি ভবনগুলোর মতো “কুল আইল্যান্ডস” বা শীতল আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এই তীব্র ও দাহ্য গরম থেকে সাময়িক মুক্তি দিচ্ছে।

কিছু বহিরাঙ্গন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বাতিল করা হয়েছে এবং অনেক স্কুল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অথবা শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ের আগেই বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

প্যারিসের এই স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপগুলো মূলত শহরটিকে আরও সবুজ ও শীতল করার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পার্কগুলোতে কুয়াশার মতো পানি ছিটানোর মেশিন ও পানির ফোয়ারা স্থাপন, আরও বেশি সাইকেল লেন ও সবুজ চত্বর তৈরি করা এবং স্কুলের আঙিনাগুলোকে আরও ছায়াময় করে তোলা।

সতর্কতা ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

২০০৩ সালের বিধ্বংসী তাপদাহের পর এই চার স্তরের সতর্কতার পরিমাপ পদ্ধতি—যার মধ্যে লাল সতর্কতা সবচেয়ে উচ্চ স্তরের—গ্রহণ করা হয়েছিল। ওই তাপদাহে ফ্রান্সে প্রায় ১৫,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যাদের মধ্যে অনেক প্রবীণ নাগরিক ছিলেন।

বর্তমানে, গড় তাপমাত্রা, পূর্বপ্রস্তুতি এবং অতীতের তাপদাহের মতো ডেটার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা সতর্কতার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। যখন পারদ ওপরের দিকে উঠতে থাকে, তখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রত্যাশিত তাপমাত্রা, তাপদাহ কত দিন স্থায়ী হতে পারে, রাতে তাপমাত্রা কমবে কি না, কী কী বড় ধরনের উৎসব-অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে কেমন ধারণক্ষমতা বা শয্যা খালি রয়েছে—ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনা করে।

ফ্রান্স হয়তো কোনো নিখুঁত সমাধান বের করতে পারেনি, তবে ২০০৩ সালের পর থেকে পরবর্তী তাপদাহগুলোর জন্য তারা আরও ভালো প্রস্তুতি নিতে পেরেছে। এবং ২০২৬ সালের এই তীব্র গরমের দিনে, ব্যাপক দৃশ্যমান প্রচারণার মাধ্যমে তাপদাহে কী করণীয় এবং কী বর্জনীয় (dos and don’ts) সে সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। দেশটির জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থার একটি স্লোগান হলো— “Passons tous en mode canicule”, যার অর্থ “চলুন সবাই তাপদাহের মোডে চলে যাই”।

 

 

 

Comments are closed.