নবনীতা রায় চৌধুরী
ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে পরিবর্তনের হাওয়া। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। টানা তৃতীয়বারের মতো ভূমিধস জয় নিয়ে আসামেও ক্ষমতায় ফিরেছে দলটি।
ভারতের দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুতে তৈরি হয়েছে নতুন ইতিহাস। ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় প্রায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা জোসেফ বিজয়ের নতুন দল ‘টিভিকে’। এর মাধ্যমে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র মতো দুই দ্রাবিড়ীয় পরাশক্তিকে পেছনে ফেলে এম কে স্টালিনের ডিএমকে সরকারের পতন ঘটিয়েছে তারা।
পরিবর্তন এসেছে কেরালাতেও। সেখানে পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকারের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ। এর ফলে ভারতের শেষ বামপন্থি সরকারেরও পতন ঘটলো। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে অল ইন্ডিয়া এনআর কংগ্রেস এবং বিজেপির সমন্বয়ে গঠিত এনডিএ জোটের ওপরই আস্থা রেখেছে মানুষ।
দলের এই অভাবনীয় পারফরম্যান্সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের এই জয়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। নয়াদিল্লিতে বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলার ভবিষ্যতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো। এটি এখন ‘ভয়মুক্ত’ হয়েছে।
বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীন বলেন, গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার গঠিত হচ্ছে। এটি কেবল ভৌগোলিক বিস্তার নয়; এটি আমাদের আদর্শ এবং বিশ্বাসের বিস্তার।
কেরালাতে জয় পাওয়ায় তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটকে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। তবে আসামে বিজেপির কাছে তারা বড় ব্যবধানে হেরে গেছে। ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির রাজনৈতিক পরিধি অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। দলটির দাবি অনুযায়ী, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে যেখানে তাদের বিধায়কের সংখ্যা ছিল ৭৭৩, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৯৮ জনে। পশ্চিমবঙ্গের এই জয়ের পর এখন বিজেপির একারই ১৭ জন মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন এবং এনডিএ জোটসহ এই সংখ্যা দাঁড়াবে ২২ জনে।
তামিলনাড়ুতে বিজয়ের দল টিভিকে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ১৯৬৭ সাল থেকে রাজ্যটিতে পালাক্রমে শাসন করে আসা ডিএমকে ও এআইএডিএমকে; এই দুই দ্রাবিড়ীয় দলকে স্তব্ধ করে দিয়েছে তারা। ভারতে এই প্রথম কোনও আঞ্চলিক দল গঠন হওয়ার এত অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষমতায় আসার নজির গড়লো।
ডিএমকে-বিরোধী হাওয়া এতটাই তীব্র ছিল যে, ক্ষমতাসীন দলটি তাদের শক্ত ঘাঁটি চেন্নাইয়েও পুরোপুরি পরাস্ত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন তার কোলাথুর আসনে ৮ হাজার ৭৯৫ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। তার মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সহকর্মীও পিছিয়ে ছিলেন। তবে তার ছেলে উদয়নিধি স্টালিন চেপাউক-তিরুভাল্লীকেনি আসন থেকে এগিয়ে ছিলেন।
অভিষেকেই বিজয়ের এই জয় ঐতিহাসিক। ভারতের নির্বাচনি ইতিহাসে এটি মাত্র তৃতীয় ঘটনা, যেখানে কোনও দল গঠনের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ক্ষমতায় এসেছে। এর আগে ১৯৮৩ সালে এন টি রামা রাও দল গঠনের নয় মাসের মাথায় এবং ১৯৮৫ সালে আসাম গণ পরিষদ দল গঠনের দুই মাসের মাথায় ক্ষমতায় এসেছিল।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে টিভিকে এখন কংগ্রেসসহ ছোট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। টিভিকে ১০৮টি আসনে জিতেছে অথবা এগিয়ে রয়েছে, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ১০টি কম। অন্যদিকে ডিএমকে-র সহযোগী দল কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, সিপিএম, সিপিআই, ভিসিকে এবং ডিএমডিকে ১৪টি আসনে জিতেছে বা এগিয়ে রয়েছে।
কেরালা ও আসাম
পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে কেরালাতেও। সেখানে পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকার ২০২১ সালে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ইতিহাস গড়েছিল। কিন্তু এবার কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে।
১৪০টি আসনের মধ্যে ইউডিএফ ১০২টি আসনে জিতেছে বা এগিয়ে রয়েছে, যা কংগ্রেসের জন্য এক বড় স্বস্তি। ২০১৪ সালের পর থেকে কংগ্রেস মাত্র সাতটি রাজ্যে নির্বাচনে জিতেছিল। কেরালায় এটি তাদের অষ্টম জয়। ইউডিএফের এই জয়ের মুখে এলডিএফের আসন সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫-এ, যার মধ্যে সিপিএম পেয়েছে ২৬টি এবং সিপিআই পেয়েছে ৮টি আসন।
আসাম- বিজেপি টানা তৃতীয়বারের মতো সেখানে জয় পেয়েছে। এমনকি দলটির আসন সংখ্যা ৬০ থেকে বেড়ে ৮২ হয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেসের আসন ২৯ থেকে কমে ১৯-এ নেমে এসেছে। মিত্র দলসহ বিজেপি ১২৬টি আসনের মধ্যে ৯৭টিতে এগিয়ে রয়েছে। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি গৌরব গগৈ জোরহাটে তার প্রথম নির্বাচনি পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছেন।
পুদুচেরিতে এনডিএ-র জয়
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে অল ইন্ডিয়া এনআর কংগ্রেস এবং বিজেপির সমন্বয়ে গঠিত এনডিএ জোট ক্ষমতা ধরে রাখতে চলেছে। ৩০টি আসনের মধ্যে এনআর কংগ্রেস ১২টিতে জিতেছে বা এগিয়ে রয়েছে। ডিএমকে ৫টি এবং বিজেপি ৪টি আসনে রয়েছে। বিজয় পরিচালিত টিভিকে দুটি আসনে জয় পেয়ে সেখানে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। অন্যদিকে এক সময় পুদুচেরি শাসন করা কংগ্রেস মাত্র একটি আসন পেয়েছে।
Comments are closed.