নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
পদ্মার পাড়ে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস। যে ঘরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবার ফেরার অপেক্ষায় মুখিয়ে থাকত ছোট্ট শিশুরা, সেই ঘর আজ নিথর। উঠোনজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা দুটি নিষ্পাপ চোখ যেন এখনও অপেক্ষা করছে প্রিয় মানুষগুলোর ফিরে আসার।
বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়া এক মায়ের আহাজারি আর চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে—পদ্মার একটি নির্মম ঢেউ মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, আশ্রয় ও অবলম্বন। জীবিকার তাগিদে নদীতে যাওয়া বাবা আফছার আলী ও তাঁর ছেলে জিয়ারুল আর কোনোদিন ঘরে ফিরবেন না। তাঁদের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান পবা উপজেলার কাটাখালী শ্যামপুর বালুরঘাট এলাকা।
এই শোকের মধ্যেই নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে পবা উপজেলা প্রশাসন। বুধবার (৩০ জুলাই) রাতের আঁধারে নিহতদের বাড়িতে ছুটে যান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন। জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলনের নির্দেশনায় তিনি নিহতদের স্বজনদের হাতে নগদ অর্থ, চাল, ডাল, তেল, লবণসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন। একই সঙ্গে নৌকাডুবি থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরা ছয়জন শ্রমজীবী ব্যক্তিকেও সহায়তার আওতায় আনা হয়।
উপস্থিত ছিলেন- উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল ইসলাম। সরকারি সহায়তা গ্রহণ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত আফছার মাঝির স্ত্রী জাহেরা বেগম বলেন, “নৌকাডুবিতে স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়েছি। মুহূর্তেই আমার সংসার শূন্য হয়ে গেছে। এই দুঃসময়ে উপজেলা প্রশাসন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমার পিতৃহারা নাতি-নাতনির লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদান দিন।” বাবা ও দাদাকে হারিয়ে নির্বাক ছোট্ট তামিম। কান্নাভেজা কণ্ঠে সে বলে ওঠে, “পদ্মা নদীর পানিতে আমার দাদা আর বাবা হারিয়ে গেছে। দাদা-বাবা বাড়ি এলে আমাদের জন্য মজা নিয়ে আসত। এখন আর কেউ মজা নিয়ে আসবে না।” শিশুটির এই সরল কথাগুলোই যেন পুরো ট্র্যাজেডির নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, “এই দুর্ঘটনায় শুধু দুটি প্রাণ হারায়নি; দুটি পরিবারের স্বপ্ন, ভরসা ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারিয়ে গেছে। একজন মা একই সঙ্গে স্বামী ও সন্তানকে হারিয়েছেন, শিশুরা হারিয়েছে তাদের বাবাকে।
এই শোক কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।” তিনি জানান, নিহত জিয়ারুলের সন্তানদের লেখাপড়া যাতে কোনোভাবেই বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউএনও আরও বলেন, “পদ্মার ঢেউ যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, তা কোনো সহায়তায় পূরণ করা সম্ভব নয়। তারপরও আমরা চাই, পরিবারগুলো যেন কখনো মনে না করে তারা একা। যেকোনো প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে। একই সঙ্গে নিখোঁজদের উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে কাজ করা হবে।”
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী নগরের বড়কুঠি এলাকার পদ্মা নদীর মাঝামাঝি স্থানে ঝাউগাছ বোঝাই একটি নৌকা প্রবল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। চর মাজারদিয়া থেকে ফেরার পথে নৌকাটিতে আটজন শ্রমজীবী ব্যক্তি ছিলেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় ছয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও প্রবল স্রোতে তলিয়ে যান মাঝি আফছার আলী ও তাঁর ছেলে জিয়ারুল। দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান চালিয়েও তাঁদের সন্ধান মেলেনি। পদ্মার ঢেউ থেমে গেলেও তাদের স্বজনদের কান্না থামেনি; নদীর পাড়জুড়ে সেই শোক এখনও ভারী হয়ে আছে।
Comments are closed.