The news is by your side.

ছায়ানটের বর্ষবরণ: ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’

5

স্নিগ্ধ শতদল

পূর্ব দিগন্তে সূর্যের রঙিন আভা ফুটে উঠতেই রমনার বটমূল প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে মানুষের পদচারণায়। লাল-সাদা শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সজ্জিত নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে যেন তৈরি হয় এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক সমাবেশ, যেখানে নতুন বছরকে বরণ করার মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয় বাঙালির আত্মপরিচয়।

আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ছায়ানট। ১৯৬৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে পহেলা বৈশাখে প্রভাতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানটি বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে লালন করে আসছে, তারা এবারও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩কে স্বাগত জানায় সুরেলা, ভাবগভীর উপস্থাপনায়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। যার অনুপ্রেরণা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবমুক্তির চেতনা।

সকাল সোয়া ৬টায় সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। ধারাবাহিকভাবে পরিবেশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও লালন সাঁইয়ের গান।

মাকছুরা আখতার অন্তরা, আজিজুর রহমান তুহিন, সেমন্তী মঞ্জরী, তানিয়া মান্নান ও লাইসা আহমদ লিসার কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত যেমন মুগ্ধতা ছড়ায়, তেমনি বিটু কুমার শীল, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি, খায়রুল আনাম শাকিল ও শারমিন সাথী ইসলাম ময়নার কণ্ঠে নজরুল সংগীত এনে দেয় দ্রোহ ও সাম্যের শক্তি। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান পরিবেশন করেন শ্রাবন্তী ধর, আর লালনের ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’ গানটি গেয়ে শোনান চন্দনা মজুমদার।

লোকগান, পল্লীগীতি ও সম্মেলক পরিবেশনায় ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’, ‘পথে এবার নামো সাথী’, ‘এসো মুক্ত করো’, ‘সেদিন আর কত দূরে’ এসব গানে গানে উচ্চারিত হয় সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মুক্তচিন্তার আহ্বান। পাশাপাশি আবৃত্তিতে উঠে আসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তসহ বিভিন্ন কবির ভাবনা। সলিল চৌধুরীর ‘এক গুচ্ছ চাবি’ আবৃত্তি করেন খায়রুল আলম সবুজ।

প্রায় ২০০ শিল্পীর অংশগ্রহণে সকাল থেকে বয়ে চলে এই সংগীত, কবিতা ও সংস্কৃতির সম্মিলিত ধারা। শিশু থেকে প্রবীণ-সবাই মিলে যেন তৈরি করে এক আত্মিক বন্ধন, যেখানে প্রজন্মের ব্যবধান মুছে গিয়ে তৈরি হয় এক সাংস্কৃতিক ঐক্য।

এই দীর্ঘ আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। তবে অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত তাৎপর্য ধরা পড়ে শেষ পর্বে, যখন বক্তব্য দেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী।

তার বক্তব্যে উঠে আসে সময়ের অস্থিরতা, সহিংসতা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির চিত্র।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পহেলা বৈশাখ কেবল উৎসব নয়। এটি বাঙালির জাতিসত্তা উন্মোচনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। গত বছরের নানা সহিংস ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংস্কৃতির ওপর আঘাত নতুন নয়। রমনার বটমূলেও ঘটেছে ভয়াবহ হামলা, যার স্মৃতি এখনও দগদগে।

সারওয়ার আলী বলেন, যে সংগীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম ও মুক্তির সঙ্গী, সেই সংগীতকেই বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে। সমাজে বাড়ছে অসহিষ্ণুতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় তৈরি হচ্ছে ভয়। বিশ্ব পরিস্থিতির অস্থিরতার কথাও তুলে ধরে তিনি বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

 

Comments are closed.