The news is by your side.

২৫  মার্চ, ১৯৭১ : যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে

বিশেষ সম্পাদকীয়

0 89

 

 

সুজন হালদার

২৫  মার্চ, ১৯৭১।  রাতের নির্জনতা ভেঙে ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র হত্যা, গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগে মেতে ওঠে বর্বর  পাকিস্তান সেনাসদস্যরা। গ্রেপ্তার করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। গ্রেপ্তারের পূর্বেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। গ্রেফতারের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু তার ধানমন্ডির বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিম্নপদস্থ এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে অসম্মানজনকভাবে গ্রেফতার করা হয় বাঙালি জাতির মহান এ স্বপ্নদ্রষ্টাকে।

সাংবাদিক সিডনি এইচ শ্যানবারগকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বর্ণনা করেন ২৫ মার্চ মধ্যরাতের সেই দুঃসহ স্মৃতি। ১৮ জানুয়ারি ১৯৭২, নিউইয়র্ক টাইমসে যা প্রকাশিত হয়।

২৫ মার্চ  ১৯৭১। সকাল থেকেই শহরজুড়ে নানামুখী গুঞ্জন। বঙ্গবন্ধু  গ্রেফতার হতে পারেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হতে পারে। জেনারেল ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্র আচ  করতে পেরে  আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধুকে  আত্মগোপনে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানান।

আস্থায় অবিচল বঙ্গবন্ধু সাড়ে সাত কোটি বাঙালির  জীবন ও সম্পদ সুরক্ষা এবং স্বাধীনতার কথা ভেবে  ধানমন্ডির নিজ বাড়িতেই অবস্থান করেন।

রাত ১০ টা। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরাপরাধ বাঙালির ওপর আক্রমণের জন্য নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান নেয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘেরাও করে মর্টার সেলিং শুরু করে।

জেনারেল ইয়াহিয়ার ষড়যন্ত্র এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা  অনুধাবন করে বঙ্গবন্ধু   আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে  পাকিস্তানি সেনারা। প্রহরীকে হত্যা করে  মূল ফটক ভেঙে  বাড়িতে প্রবেশ করে  পাকিস্তানি সৈন্যরা।

১৯৭২ সালে দেশে ফেরার পর নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন,  পাকিস্তানি সেনারা গুলি চালাতে চালাতে সিড়িতে উঠলে তিনি নিজেই দরজা খুলে দেন।

পাকিস্তানি সৈন্যদের বঙ্গবন্ধু বলেন, তোমরা কেন গুলি করছো? যদি  গুলি করতে চাও, আমাকে গুলি করো। তোমরা কেন আমার জনগণ এবং  শিশুদের গুলি করছো?

বঙ্গবন্ধুর হুংকারের পর একজন মেজর গুলি বন্ধের নির্দেশ দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বলেন–আপনি গ্রেপ্তার।

বঙ্গবন্ধু তার প্রিয়তমা স্ত্রী  ও শিশুপুত্র রাসেলকে চুমু খান। বিদায় নেয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু বলেন, ওরা আমাকে হত্যা করতে পারে। আর কোনদিন দেখা নাও হতে পারে। কিন্তু আমার জনগণ একদিন স্বাধীন হবে। আমার আত্মা সেটি দেখবে এবং খুশি হবে।

পাকিস্তানি সেনারা বঙ্গবন্ধুকে বন্দুকের বাট দিয়ে আঘাত করে  জিপের কাছে নিয়ে আসে।৩২ নম্বর বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে ন্যাশনাল  অ্যাসেম্বলি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি চেয়ারে বসিয়ে চা খেতে দিলে বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ থেকে তামাশার সুরে বেরিয়ে আসে, আমার জীবনে চা খাওয়ার এটি সর্বশ্রেষ্ঠ সময়!

পরে বঙ্গবন্ধুকে ক্যান্টনমেন্টের একটি স্কুলের অন্ধকার ও নোংরা কক্ষে ৬ দিন বন্দি রাখা হয়। ১ এপ্রিল ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধুকে আকাশ পথে নেওয়া হয় পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে।  পাঠানো হয় মিয়ানওয়ালি কারাগারে,  রাখা হয় ফাসির কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত কনডেম সেলে। কনডেম সেলে থেকেও  বঙ্গবন্ধু এতোটুকু বিচলিত হন নি, ভেঙে পড়েন নি। আপোষ করেন নি। মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে প্রহর গুনেছেন বাঙালির মুক্তির,  বাংলার স্বাধীনতার।

আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি স্কুলের অন্ধকার কক্ষে আটক রাখা হয়। ১ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় রাওয়ালপিন্ডি।

পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগার এবং পাঞ্জাব প্রদেশের লয়ালপুর ও শাহীওয়াল জেলে বঙ্গবন্ধুকে কনডেম সেলে আটক রাখা হয়।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাসহ ১২ টি অভিযোগ আনা হয় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। আইনের ছাত্র হওয়ায় বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন এসব অভিযোগ থেকে মুক্তির সম্ভাবনা নেই। বঙ্গবন্ধু সময়ক্ষেপণের চেষ্টা করেন। পাকিস্তানের  সর্বজনগ্রহণযোগ্য আইনজীবী একে ব্রহিকে তার পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য নিয়োগের দাবি জানান বঙ্গবন্ধু।

লায়লপুর সামরিক আদালতে শুরু হয় বিচার কার্যক্রম। বিচারের নামে যে  প্রহসন করা হচ্ছে, তা বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধু তার আইনজীবীকে ফেরত পাঠান।

জেনারেল ইয়াহিয়া পাকিস্থানে মার্শাল ল’ জারি করেন। ইয়াহিয়া বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান রাজি হোক বা না হোক তার পক্ষে আইনজীবী দিতে হবে।

নিউইয়র্ক টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, আইনজীবী নিয়োগ দেয়ার নামে পাকিস্তান সরকার মূলত দেখাতে চেয়েছিল তারা আমার একতরফা বিচার করছে না। আমাকে ডিফেন্ড করার জন্য সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এই বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানিরা মূলত আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর একটি সার্টিফিকেট তৈরি করতে চেয়েছিল। ৪ ডিসেম্বর শেষ হয় বিচার কার্যক্রম। তখন  ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী সামরিক ঘাঁটি একের পর এক ধ্বংস করতে থাকে।

জেনারেল ইয়াহিয়া সামরিক আদালতের সকলকে রাওয়ালপিন্ডি ডেকে পাঠান এবং রায়ের খসড়া তৈরি করার নির্দেশ দেন। যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সামরিক কর্মকর্তারা রায়ের খসড়া তৈরি করতে পারেননি, শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়ার পক্ষে প্রহসনমূলক এবং হাস্যকর রায় প্রদান করা সম্ভব হয়নি।

৭ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুকে লয়ালপুর থেকে নেয়া হয় মিয়ানওয়ালী কারাগারে। ১৫  ডিসেম্বর পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নতুন  নীল নকশা তৈরি করে। মিয়ানওয়ালী কারাগার বন্দী পাকিস্তানি কয়েদিদের মধ্যে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে দেয়া হয় যে পূর্ব বাংলায় বাঙালিরা জেনারেল নিয়াজীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, এর প্রতিবাদে তারা কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবে। এই ভয়াবহ হত্যার পরিকল্পনার  কথা বঙ্গবন্ধুকে জানান কারাগারের জেল সুপার।

মিয়ানওয়ালী কারাগারের জেল-সুপার বঙ্গবন্ধুকে রাত ৪ টায় কনডেম সেল থেকে বের করে তার নিজ বাড়িতে নিয়ে যান এবং সেখানে বঙ্গবন্ধু দুই দিন অবস্থান করেন।

১৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের বিষয়টি জানাজানি হলে ওই জেলসুপার বঙ্গবন্ধুকে আরো কয়েক মাইল দূরে একটি বাড়িতে নিরাপদে রেখে আসেন, সেখানে বঙ্গবন্ধু নয় দিন অবস্থান করেন।

এরইমধ্যে পাকিস্তানের পরাজয় ঘটে এবং স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।  পাকিস্তানেও রাষ্ট্রক্ষমতার বদল হয়।  জেনারেল ইয়াহিয়া জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

জুলফিকার আলী ভুট্টো নির্দেশে মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে আসা হয়। বন্দী রাখা হয় প্রেসিডেন্টের গেস্ট হাউসে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে জানান জেনারেল ইয়াহিয়া তাকে হত্যা করার জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বে সামরিক আদালতের কাগজে স্বাক্ষর করে যেতে চেয়েছিলে কিন্তু তিনি রাজি হননি। ভুট্টো রাজি না হওয়ার কারণ, রাজনৈতিক।

ভুট্টো বুঝতে সক্ষম হন যে,  যদি পাকিস্থানে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে  বন্দী ৯৩ হাজার সৈন্যদের বাঙালিরা পিটিয়ে হত্যা করবে। যার দায় পড়বে তার উপর।

জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন।  ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখবার অনুরোধ জানান।

বঙ্গবন্ধু তখন ভুট্টোর  কাছে জানতে চান, আমি কি মুক্ত নাকি বন্দি। যদি আমি মুক্ত হই, আমাকে যেতে দিন। যদি মুক্ত না হই, তাহলে তো আমি কথা বলতে পারিনা।

জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলেন বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের অভিন্ন আইন এবং ঐতিহ্য বিরাজমান থাকায় দুই দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে।

বঙ্গবন্ধু জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জাতীয়ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাকে সম্মান দেখানো হয়নি। আপনি যদি এখনও পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্র মনে করেন তাহলে তো আপনি প্রেসিডেন্ট এবং চীফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হতে পারেন না। আমি হতে পারি।

৭ জানুয়ারি তৃতীয় এবং শেষ বারের মত  জুলফিকার আলী ভুট্টো দেখা করেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বলেন, আমাকে আজ রাতেই মুক্তি দিন। আর মুক্তি না দিলে মেরে ফেলুন। ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে জানান এত স্বল্প সময়ের মধ্যে মুক্তির আয়োজন করা কঠিন। অবশেষে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিয়ে লন্ডন পাঠানো হয়।

পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু লন্ডন এবং দিল্লি হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.