The news is by your side.

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ: গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২২

0 156

 

সুজন হালদার

 

নগর জীবনের ব্যস্ততায় নিয়ত ছুটে চলছে – মানুষ। ব্যক্তিগত কাজে কিংবা অফিসে, ভোর থেকে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা  ; যে যার প্রয়োজনে ছুটে চলছে।  সাপ্তাহিক ছুটি, উৎসব কিংবা জরুরী প্রয়োজনে দূরের গন্তব্যেও  ছুটছে মানুষ।

 

প্রাত্যহিক এ ছুটে চলার বেশিরভাগ সময়ই পার করতে হচ্ছে – সড়ক কিংবা মহাসড়কে।  পথের দৈর্ঘ্য স্বল্প কিংবা দূরে  ; যাই হোক না কেন – প্রত্যেকেরই  চাওয়া,  নিরাপদে বাসায় ফেরা।

কিন্তু প্রতিদিনকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় দুঃস্বপ্ন হয়ে মাঝেমধ্যেই তাড়া করে ফিরছে দুর্ঘটনা। কখনো কখনো ডেকে আনছে মৃত্যু। সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য প্রাথমিকভাবে গাড়ির চালককে দায়ী করা হয়।  তবে যাত্রী কিংবা পথচারীদের অসতর্কতাও অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ:

* অত্যাধিক  আত্মবিশ্বাস

* মাত্রাতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো

* অননুমোদিত ওভারটেকিং

* অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন

* অপ্রশস্ত রাস্তা

* জনসংখ্যার চাপ ও অপ্রতুল পরিবহন ব্যবস্থা

* ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী বহন

* অদক্ষ চালক ও হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো

সড়ক এবং মহাসড়কে গাড়ি, যাত্রী এবং পথচারীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে;  যে কারণে সমন্বিত সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং  ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও  দুর্ঘটনার সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে পারছে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা এবং অন্যান্য নগরীতে ট্রাফিক ব্যবস্থায়   ইতিমধ্যে জনবল বাড়ানো হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। হাইওয়ে পুলিশ-  দূরপাল্লার গাড়ি নিয়ন্ত্রণ এবং গাড়ির চালকের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল সার্ভার ব্যবহার করছে।

কোন দুর্ঘটনা ঘটে গেলে-   কে  দায়ী ; কে দায়ী নয়-  সে বিষয়ে তদন্ত কিংবা যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দাঁড় করানো যেতেই পারে কিন্তু কেউ নিহত হলে, তাকে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

দুর্ঘটনার পরে অনেক সময়,   নিরাপদ সড়ক আইন এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে কথা হয়।  কিন্তু  কেবলমাত্র আইন এবং  প্রশাসন দিয়ে  সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়। প্রয়োজন সর্তকতা।

বিদ্যমান বাস্তবতায় এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তাই সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে জোর দেয়া হচ্ছে জনসচেতনতা উপর।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উপায়:

* বেপরোয়া গতি ও অননুমোদিত ওভারটেকিং থেকে বিরত থাকা

* ফিটনেস ও সার্টিফিকেটবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো থেকে বিরত থাকা

* নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা

* ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ

* অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন এর ক্ষেত্রে সচেতন থাকা

* পথচারীদের সতর্কভাবে চলাফেরা

* সড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

* গাড়ি চালানো অবস্থায় চালকের কথা বলা থেকে বিরত থাকা

সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে সরকার সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করে। ১ নভেম্বর ২০১৯ তারিখ থেকে যা কার্যকর হয়।

নতুন আইনের  বিধিবিধান :

১. নতুন আইনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে শাস্তির বিধান।  দায়ী চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

২.  নিবন্ধন সনদ না নিয়ে রাস্তায় যানবাহন নামালে গাড়ির মালিককে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ।

৩. গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ।

৪. লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ছয় মাসের জেল অথবা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা। অথবা উভয় দণ্ড ।

৫. ভাড়ার তালিকা না থাকলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা এক মাসের কারাদণ্ড।

৬. ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাবে ভাড়ার মিটার বাধ্যতামূলক ।

৭. যানবাহনচালককে সংকেত মেনে চলতে হবে, তেমনি পথচারীকে সড়ক-মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, পদচারী সেতু, পাতালপথসহ নির্ধারিত স্থান দিয়ে পার হতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে চালক ও পথচারীকে  ১০ হাজার টাকা জরিমানা ।

৮. যত্রতত্র হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা।

৯. কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা।

অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

 প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা

* গাড়ির চালক ও তার সহকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা

* লংড্রাইভের সময় বিকল্প চালক রাখা, যাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কোনো চালককে একটানা দূরপাল্লায় গাড়ি চালাতে না হয়

*নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি করা

* অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ

* সড়কে যাতে সবাই সিগন্যাল মেনে চলে, তা নিশ্চিত করা

* পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করা

প্রধানমন্ত্রীর  বিশেষ নির্দেশনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭ টি নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর  কার্যালয়ের উল্লেখযোগ্য নির্দেশনা:

*  ঢাকা শহরে চলমান সব গণপরিবহন, শহরে চলাকালে সব সময় দরজা বন্ধ রাখা

*  গণপরিবহনে (বিশেষত বাসে) দৃশ্যমান দুটি স্থানে চালক ও হেলপারের ছবিসহ নাম, চালকের লাইসেন্স নম্বর, মোবাইল নম্বর প্রদর্শন নিশ্চিত করা

* ঢাকা শহরের যেসব স্থানে ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস রয়েছে, সেসব স্থানের উভয় পাশে ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার সম্পূর্ণ বন্ধ করা।

* ট্রাফিক সপ্তাহে চলমান সব কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত যথাসম্ভব অব্যাহত রাখা।

*ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি বা শুরু হওয়ার সময় অপেক্ষাকৃত জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী, স্কাউট ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) সহযোগিতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের উদ্যোগ নিতে হবে।

* রুট পারমিট/ফিটনেস-বিহীন যানবাহনসমূহকে দ্রুত ধ্বংস করার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।

যেকোনো দুর্ঘটনাই অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক।  আর  সেই  দুর্ঘটনা যদি মৃত্যু ডেকে আনে, তাহলে তা আরও  বেশি বেদনাদায়ক।

গত ১৪  বছরে সড়ক-মহাসড়ক অনেকটাই সম্প্রসারিত হয়েছে। নির্মিত হয়েছে নতুন সড়ক। পদ্মা সেতু এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর মতো বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি অনেক সেতু নির্মিত হয়েছে।

তবে মাঝে মধ্যেই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যাওয়া কিংবা গাড়ির নিচে চাপা পড়ে  পথচারীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

দেশে নিরাপদ সড়ক   আইন রয়েছে, আইনের বাস্তবায়নও হচ্ছে।   তবু দুর্ঘটনা পিছু ছাড়ছেনা ।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।  একসঙ্গে কাজ করছে হাইওয়ে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগ।  সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং রাখার পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিকরাও দুর্ঘটনা এড়াতে পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক।

এখনই প্রয়োজন গাড়ি চালক যাত্রী এবং পথচারীদের সর্বোচ্চ সর্তকতা।  একইসঙ্গে জরুরী  ট্রাফিক আইন মেনে চলার ব্যাপারে পথচারী এবং যাত্রীদের সচেতনতা ।

কেবলমাত্র সে ক্ষেত্রে সফল হবে-  জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য  –  আইন মেনে সড়কে চলি, নিরাপদে ঘরে ফিরি।

Leave A Reply

Your email address will not be published.