The news is by your side.

তারুণ্যের প্রত্যাশা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানবিক দেশ

0 49

 

স্বাধীনতার ৪৮তম বার্ষিকীতে মঙ্গলবার লাখো মানুষের জনস্রোতে মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। লাল-সবুজ পোশাকে জাতীয় পতাকা হাতে সমবেত হয়েছিলেন সব বয়সের এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করা জাতির সূর্যসন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে পুষ্পস্তবক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা। এবার মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে স্মৃতিসৌধে দলে দলে এসেছেন বিশেষত কিশোর এবং তরুণ বয়সীরা। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে বীর শহীদদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদ রুখে দিয়ে মানবিক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়।

ভোর ৬টায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং তার পরপরই জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পক্ষ থেকে তারা প্রথম ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্মৃতিসৌধের বেদিতে। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা। এ সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। গার্ড অব অনার দেয় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল।
পরে দলের সভাপতি হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে আবারও স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেন শেখ হাসিনা। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান (সাভারের এমপি), শাজাহান খানসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতির প্রতি পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা জানান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসংগ্রামী এবং বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানরা।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধ এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পর সর্বস্তরের জনতার জন্য স্মৃতিসৌধের ফটক খুলে দেওয়া হয়। এ সময় জনতার ঢল নামে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। আগে থেকেই ফটকের বাইরে ব্যানার নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরা একের পর এক প্রবেশ করতে থাকেন। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্লোগান ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অব্যাহত উন্নয়নের পক্ষে নানা স্লোগান দেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সুশৃঙ্খলভাবে মৃদু পায়ে এগিয়ে পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারা। বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি দলে দলে ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ। জনতার ঢলে স্মৃতিসৌধ এলাকা পরিণত হয় মিলন মেলায়। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় স্মৃতিসৌধের বেদি।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতা দখলের পর বিএনপি-জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার কারণেই এতদিন একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই স্বীকৃতির জোরালো দাবি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যে আদর্শ ও চেতনা নিয়ে এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, জীবন দিয়েছিল, আজকে তা সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। গণতন্ত্রকে হত্যা করে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার চক্রান্ত চলছে। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, শ্যামা ওবায়েদ এবং ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন বাবু।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর গণফোরামের সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেন বলেন, গণতন্ত্রকে শাসন ব্যবস্থা হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি দিতে পারলেও দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুরোপুরি গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। যে সংসদ সত্যিকারের অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং জনগণের আশা পূরণ করবে, সে ধরনের সংসদ পাইনি। এ জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।

সকালে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলটির নেতাকর্মীরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ, প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম, অধ্যাপক মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অধ্যাপক রওশন আরা মান্নানসহ অন্যান্য নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বলেন, দেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা স্থিতির জায়গা এলেও নতুন চ্যালেঞ্জ সবার সামনে এসেছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি সমাজে প্রবলভাবে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, এখন সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। আগামী পাঁচ বছরে বৈষম্য দূর করে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যেতে হবে।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যে বাংলাদেশ আজ দেখছি তার জন্য একাত্তরে যুদ্ধ করিনি। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই তাই চালিয়ে যেতে হবে।
সহকর্মীদের নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অর্জনের মূল্যবোধ তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মূল্যবোধের বিকাশের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আরও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবে। গুজবকে বর্তমান সময়ের বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন দীর্ঘ ২৮ বছর পর গঠিত ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর। তার সঙ্গে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্য কর্মীরা ছিলেন। নুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, নব্বইয়ের পর থেকে যারা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা ছাত্রদের অধিকারকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একাত্তরের বীর শহীদরা শিখিয়ে গেছেন সবার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা। সেই চেতনা নিয়ে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের প্রাত্যহিক সংকট ও সমস্যার সমাধান করতে এবং মুক্তচিন্তার ন্যায্য অধিকার ও দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করছে। দীর্ঘদিন পর ডাকসু নির্বাচন হয়েছে। এখন অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হল সংসদের ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি জানান, তাদের পূর্ব প্রজন্ম স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে। তাদের সেজন্য কৃতজ্ঞ থেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দেশকে এগিয়ে নেওয়া উচিত। দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব তরুণদেরই নিতে হবে।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে আসা একাত্তরের গেরিলা যোদ্ধা এম এ মান্নান শিকদার বলেন, পঁচাত্তরের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নানাভাবে বিকৃত করা হয়েছে। এই ভুল ইতিহাস একসময় নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্তও করেছে। কিন্তু আশার কথা, নতুন প্রজন্ম নিজেদের আগ্রহেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে নিচ্ছে। বর্তমান সরকারও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণে অনেক ভালো উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটির নির্বাহী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল হাই এবং মহাসচিব সফিকুল বাহার টিপু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

স্মৃতিসৌধ চত্বরে ঢাকা জেলা কমিউনিটি পুলিশিং সেল আয়োজন করে ‘গৌরবময় স্বাধীনতা ২০১৯’ নামে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং একাত্তরের স্মৃতিময় ছবি ও পোস্টার নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর। এমন একটি ব্যতিক্রমী আয়োজনের প্রশংসা করেন সবাই।

বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা : সকাল থেকে দুপুরের পরও বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, সিপিবি, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারবর্গ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা জেলা পুলিশ, বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.