মেহেরুন নেসা মিমি
ঢাকাসহ দেশজুড়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। অসহ্য গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। কোনও কোনও জেলায় সাত থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং দেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে মানুষের। একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তি বেড়েছে তাদের। সবচেয়ে বিপাকে আছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।
ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ শহরে দিনে-রাতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আর গ্রামে ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলার মানুষজন। গ্রামের কেউ কেউ বলছেন, লোডশেডিং নয়; মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ আসে।
শুক্রবার ছুটির দিন ছিল। এদিনও পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চার বারে চার ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। গত ১০ দিনের বেশি সময় ধরে প্রতিদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল হক বলেন, ‘শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকাল ৫টার সময় ময়মনসিংহ জোনে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৩০৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেছে ৯৫৭ মেগাওয়াট। এই হিসেবে লোডশেডিং ছিল সর্বোচ্চ ৩৫০ মেগাওয়াট। তবে এই লোডশেডিং ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তন হয়।’
যশোর
যশোর শহরে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তিনবারে তিন ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হয়েছে। এরপর শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তিনবার লোডশেডিং। একবার বিদ্যুৎ গেলে ৪০ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা পর আসে। দিনে-রাতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।
চাহিদা মতো বিদ্যুৎ না পেয়ে দিন কিংবা রাতের বেশিরভাগ সময় কষ্ট করতে হচ্ছে মানুষকে। ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাহিদার তুলনায় ২৫-৩৫ শতাংশ পাচ্ছেন সরবারহ।
কিশোরগঞ্জ
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নের কামাল বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। একটু পর পর চলে যায়। আমার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। গরম আর রাতের অন্ধকার মিলিয়ে পড়াশোনা ঠিকমতো করতে পারছে না। ভোগান্তির পাশাপাশি দুশ্চিন্তায় আছি।’
নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার মধ্যে বন্দর, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে গড়ে প্রতিদিন ১০-১৪ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এর মধ্যে বন্দরে পাঁচ-সাত, সোনারগাঁয়ে ১০-১২, আড়াইহাজারে ১২-১৬, রূপগঞ্জে ১০-১২ এবং নারায়ণগঞ্জ শহরে অর্থাৎ সদরে দুই-তিন ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে।
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি উপজেলার মধ্যে বন্দর, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর প্রতিদিন ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা হলেও ৩০-৪০ শতাংশ কম পাওয়া যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ১৪০।
নোয়াখালী
নোয়াখালীতে লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মানুষ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। ভ্যাপসা গরমে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন তারা। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যেও দেখা দিয়েছে মন্দা। বিদ্যুতের কারণে শিল্পনগরীগুলোতে নষ্ট হচ্ছে শ্রমঘণ্টা। প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে থাকতে হচ্ছে গ্রামের বাসিন্দাদের। তবে শহরে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা থাকছে লোডশেডিং।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্যমতে, নোয়াখালীতে তাদের ৮ লাখ ২০ হাজার গ্রাহক। প্রতিদিন পিক-আওয়ারে তাদের চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু তারা প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট করে সরবরাহ করতে পারছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নোয়াখালী জেলা শহরের চাহিদা প্রতিদিন ৩৬ মেগাওয়াট থাকলেও তারা গড়ে ১৫ মেগাওয়াট করে বরাদ্দ পাচ্ছে।
রংপুর
রংপুরে ভয়াবহ লোডশেডিং আর প্রচণ্ড তাপদাহে জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং চলছে। এতে ছোট ছোট কলকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নগরীর শপিংমল আর মার্কেটগুলোতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে সারাদিনই লোডশেডিং চলছে। বিশেষ করে গ্রামে দিনে দুই-তিনবার বিদ্যুৎ এসে এক ঘণ্টা থেকে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং থাকে। রাতের ১১টা কিংবা ১২টার আগে বিদ্যুৎ আসে না। সবমিলিয়ে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকছে।
এসএসসি পরীক্ষার্থী মোসলেমা তাবাসসুম বলেন, ‘এখন তো বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প হিসেবে কুপি ব্যবহার হয় না। মমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে বসলেও গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ি। দিনে-রাতে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না।’নেসকোর রংপুরের সহকারী প্রকৌশলী আমিন উদ্দিন বলেন, ‘জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’
বরিশাল
বরিশালে শহরে পাঁচ ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে ১০ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং থাকছে প্রতিদিন। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তার মধ্যে সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোকসান হচ্ছে তাদের।
নগরীর রূপাতলির ৩৩ কেভি সাবস্টেশনের কন্ট্রোল রুম সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিন বরিশাল ও ঝালকাঠিতে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৯০ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট। সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৪২ মেগাওয়াট। এ কারণে পিক-আওয়ার ও অফ পিক-আওয়ারে শহরে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুর কুমার স্বর্ণকার জানান, তার আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৭৯ মেগাওয়াট। বরাদ্দ পাচ্ছেন ৫০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তার আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৩৯ মেগাওয়াট। তাকে সরবরাহ করা হচ্ছে ২১ মেগাওয়াট।
রাজশাহী
ঘন ঘন লোডশেডিং ও তীব্র তাপপ্রবাহে রাজশাহীর জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট শহর ও গ্রামাঞ্চলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া পণ্য উৎপাদন, কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। নেসকো কর্মকর্তারা জানান, গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
ফরিদপুর
ফরিদপুরে টানা কয়েকদিনের তীব্র গরম ও দিনরাত ঘনঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। ঘরে-বাইরে সবখানে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বাসিন্দাদের। বিশেষ করে নয়টি উপজেলার মধ্য বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত চলছে লোডশেডিং। দিনরাত মিলে গড়ে ৯-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সেবা পাচ্ছেন গ্রাহকরা। উপজেলা সদর থেকে গ্রামের পরিস্থিতি আরও নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চাহিদার তুলনায় ফরিদপুরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বোয়ালমারী জোনাল অফিসার দিপু হালদার বলেন, ‘বোয়ালমারীর দুটি উপকেন্দ্র (বোয়ালমারী পুরো উপজেলা ও আলফাডাঙ্গার কিছু অংশ) পিক আওয়ারে চাহিদা ২৪ মেগাওয়াট এবং অফপিক আওয়ারে চাহিদা ১৮-২০ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে ৪০-৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও প্রচণ্ড গরমের কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ হচ্ছে সাপ্লাই কোম্পানি। উৎপাদনের সাথে সম্পর্ক নেই। যা পাওয়া যায় তাই সাপ্লাই করতে হয়।’
গাজীপুর
গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। শহরাঞ্চলে কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্র সবখানেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবুল বাশার আজাদ বলেন, ‘এই জোনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় ১৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।’
Comments are closed.