জান্নাতুল ফেরদৌস
দেশের মূল ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং স্বতন্ত্র ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কওমি মাদ্রাসা।
ব্যক্তি উদ্যোগ ও দাতা গোষ্ঠীর অনুদানে পরিচালিত এসব মাদ্রাসা মূলত দেওবন্দি আদর্শ ও সিলেবাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। কওমি মাদ্রাসাগুলো- কয়েকটি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় মূলত – কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি সাহিত্য এবং ইসলামী দর্শনের ওপর উচ্চতর শিক্ষা দেওয়া হয়।
তবে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব মাদ্রাসার ছাত্র এবং শিক্ষকদের উগ্র ইসলামী মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে বাংলাদেশে যতগুলো জঙ্গি সংগঠনের উত্থান ঘটেছে (যেমন: হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ বা হুজি-বি, জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবি, এবং আনসার আল ইসলাম), তাদের অধিকাংশ সদস্য ও নেতার কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযোগ পাওয়া গেছে।
তদন্ত সংস্থাগুলোর মতে, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সাধারণত মাদ্রাসার সংবেদনশীল ও আদর্শবাদী তরুণ শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে বা ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যাখ্যা দিয়ে উগ্র মতাদর্শে দীক্ষিত করার সুযোগ নেয়। তবে সকল কওমি মাদ্রাসার শতভাগ ছাত্র- শিক্ষক উগ্রবাদী কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত, বিষয়টি এমন নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু মাদ্রাসার কিছু সংখ্যক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার দায় পুরো কওমি মাদ্রাসা ব্যবস্থার ওপর বর্তায় না। এটি মূলত কিছু বিপথগামী ব্যক্তির অপরাধ।
রাজধানীতে লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা, ফরিদাবাদ জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম মাদ্রাসা, যাত্রাবাড়ী জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদ্রাসা, মোহাম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা, বারিধারাজামিয়া মাদানিয়া মাদ্রাসা, মালিবাগ জামিয়াশরইয়্যাহ মাদ্রাসা, বড় কাটরা মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়াজামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম মাদ্রাসায় সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ মাদ্রাসা আবাসিক। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সঙ্গে দেশের মূল ধারা শিক্ষা ব্যবস্থার কোন সম্পর্ক নেই।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডক্টর মিজানুর রহমান বলেন, ধর্মীয় শিক্ষার নামে এসব মাদরাসায় ধর্মান্ধতা, উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ এবং জঙ্গিবাদী প্রশিক্ষণ চলে। তবে কওমি মাদ্রাসায় জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের কথা অস্বীকার করেন লালবাগ জামিয়া পুরানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তিনি জানান, সমাজের গরীব এবং শিক্ষা লাভের সুযোগ বঞ্চিত ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে এখানে ধর্মীয় এবং নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়।
ইসলামী চিন্তাবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নানা স্বার্থান্বেষী মহল অনেক সময় ধর্মীয় শিক্ষার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বা আবেগী তরুণদের বিভ্রান্ত করে অন্ধকার পথে নিয়ে যায়। কওমি মাদ্রাসার সাধারণ ও সংবেদনশীল শিক্ষার্থীরা অনেক সময় না বুঝে এই প্রোপাগান্ডার শিকার হন।
বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলা, সাম্প্রদায়িক উস্কানি এবং উগ্র সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র- শিক্ষকের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসায় সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- “আসলে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে কী পড়ানো হয়?
অনুসন্ধানে জানা যায়, কওমি মাদ্রাসাগুলোতে প্রাথমিক স্তরে শুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, মৌলিক দ্বীনি মাসআলা এবং দোয়া-কালাম শিক্ষা দেওয়া হয়। তবে সরকারের উদাসীনতায় এসব মাদ্রাসায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোন মনিটরিং সেল নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, কোন ধরনের সরকারি তদারকি না থাকায় এসব মাদ্রাসায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার বদলে ধর্মান্ধতা এবং উগ্রতা শেখানো হয়। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের সুবিধামতো এসব শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাস ও জঙ্গী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করে। গোয়েন্দা সংস্থা – সিআইডি প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, বেশ কিছু কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে। তবে ঢালাওভাবে সব মাদ্রাসা কিংবা শিক্ষক শিক্ষার্থী উগ্রবাদী কিংবা জঙ্গি মতাদর্শে বিশ্বাসী – এমনটা বলা ঠিক নয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ২৫,০০০ (পঁচিশ হাজার)। এর সঙ্গে নূরানি, হাফিজিয়া এবং ইবতেদায়ী স্তরের সংযুক্ত ও স্বতন্ত্র মাদ্রাসার নেটওয়ার্কও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি।
দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ (সাত মিলিয়ন)। এর মধ্যে বড় একটি অংশ নূরানি, নাজেরা, হিফজ এবং কিতাবখানায় (মাধ্যমিক ও উচ্চতর স্তর) পড়াশোনা করছে।