The news is by your side.

ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহলে মুখরিত রাজশাহীর আমের হাট

13

মো: শাহরিয়ার শেখ সুমন,  রাজশাহী

আম। আমের কথা উঠলেই- চোখের সামনে ভেসে ওঠে পদ্মাপাড়ের সিল্কসিটি রাজশাহীর নাম। জ্যৈষ্ঠ পেরিয়ে আষাঢ়ের এই সময়ে রাজশাহীর বাতাসে এখন কেবলই পাকা আমের গন্ধ। রাজশাহীর প্রধান আমের জাতসমূহ রাজশাহীর মাটির গুণ আর আবহাওয়ার কারণেই স্বাদে অনন্য।

ক্ষীরশাপাত বা হিমসাগর: আমের রাজভাণ্ডারে অন্যতম সেরা বলা যায়। আঁশহীন, ঘন শাঁস আর তীব্র মিষ্টি স্বাদের এই আমটির মৌসুম এখন প্রায় শেষের দিকে। তবে এখনো এর চাহিদা আকাশচুম্বী।

ল্যাংড়া: জুনের মাঝামাঝি থেকে এই আমের ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে। কাঁচা অবস্থাতেও চমৎকার গন্ধযুক্ত এই আমটি পাকার পর হালকা টক-মিষ্টির এক স্বর্গীয় স্বাদ এনে দেয়। এর পাতলা চামড়া এবং প্রচুর রসের কারণে এটি আমপ্রেমীদের ভীষণ প্রিয়।

আম্রপালি: সবেমাত্র বাজারে আসতে শুরু করেছে এই জাতটি। আকারে কিছুটা মাঝারি হলেও এর গাঢ় কমকলা রঙের শাঁস এবং কড়া মিষ্টি স্বাদের জন্য এর আলাদা একটি ভক্তদল রয়েছে।

ফজলি ও লক্ষণভোগ: দেরিতে পাকার জাত হিসেবে ফজলি আমও বাজারে উঁকি দিতে শুরু করেছে, যা আকারে বেশ বড় এবং আচার বা আমসত্ত্বের জন্য দারুণ। অন্যদিকে, স্বাদে কিছুটা কম হলেও দেখতে আকর্ষণীয় এবং দীর্ঘ সময় ভালো থাকার কারণে ‘লক্ষণভোগ’ বা ‘লখনা’ আম বাণিজ্যিকভাবে বেশ সফল।

আমের বাজার: রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের হাট পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজার এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহলে মুখরিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা আসছেন আম কিনতে। প্রতিদিন শত শত ট্রাক আম ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশালসহ দেশের প্রতিট জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

চলতি মৌসুমের পাইকারি বাজার দর লক্ষ্য করলে দেখা যায়- বাজারে ল্যাংড়া আম পাইকারি পর্যায়ে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা প্রতিমন বিক্রি হচ্ছে। প্রতিমন ক্ষীরশাপাত বা হিমসাগর আম সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা, আম্রপালি তিন হাজার থেকে তিন হাজার দুইশ, ফজলি দুই হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ : রাজশাহীর আমকে কেন্দ্র করে যেমন বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি প্রতি বছরই কিছু চেনা সংকটের মুখোমুখি হতে হয় চাষিদের।

‘ঢলন প্রথা’: আধুনিক যুগেও রাজশাহীর আম বাজারে ‘ঢলন প্রথা’ টিকে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এক মণ সমান ৪০ কেজি হলেও, এই প্রথার কারণে চাষিদের আড়তে প্রতি মণে ৪৫ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত আম দিতে হয়। ফলে সাধারণ কৃষকরা আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েন।

মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব:   আড়তদার ও ফড়িয়াদের কারণে প্রকৃত চাষিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

হিমাগারের অভাব :পচনশীল এই ফলটি ধরে রাখার জন্য রাজশাহীতে কোনো বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার নেই। আম দ্রুত পেকে গেলে চাষিরা তা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন, যার সুযোগ নেয় মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট।

জলবায়ু পরিবর্তন: আবহাওয়ার পরিবর্তন, তীব্র খরা এবং অসময়ের কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে এ বছর আমের ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রপ্তানি: সব বাধা পেরিয়ে রাজশাহীর ‘নিরাপদ আম’ এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। এ বছর ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিতে উৎপাদিত প্রায় ২০০ মেট্রিক টন আম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ইতিমধ্যে চলতি মৌসুমের প্রথম চালানে ২৫০ কেজি হিমসাগর এবং ৩০০ কেজি আম্রপালি আম ফ্রান্সে পাঠানো হয়েছে। তবে বিমান ভাড়া বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক কিছু অস্থিরতার কারণে রপ্তানির পুরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে কিছুটা সংশয় কাজ করছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চলতি বছর জেলায় ১৯ হাজার ১৮৮ হেক্টর জমিতে আমের বাগান থেকে ২ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের আশা করছে ।

কিছু প্রাকৃতিক ও বাজারগত চ্যালেঞ্জ থাকলেও রাজশাহীর আমের যে আদি ও অকৃত্রিম স্বাদ, তা বরাবরের মতোই এবারও জয় করে নিয়েছে বাঙালি হৃদয়। রসালো এই মধুর ফলটির স্বাদ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়!

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Comments are closed.