বাংলা কবিতা : বাস্তবতার নিরিখে মূল্যায়ন Reviewed by Momizat on .   ইয়াসির আজিজ বর্তমানে বাংলাদেশের কবি ও কবিতার ক্ষেত্রে দুটো বিপরীত বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো কবি ও কবিতার সংখ্যাধিক্য। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম   ইয়াসির আজিজ বর্তমানে বাংলাদেশের কবি ও কবিতার ক্ষেত্রে দুটো বিপরীত বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো কবি ও কবিতার সংখ্যাধিক্য। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম Rating: 0
You Are Here: Home » কালস্রোত » বাংলা কবিতা : বাস্তবতার নিরিখে মূল্যায়ন

বাংলা কবিতা : বাস্তবতার নিরিখে মূল্যায়ন

 

ইয়াসির আজিজ

বর্তমানে বাংলাদেশের কবি ও কবিতার ক্ষেত্রে দুটো বিপরীত বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো কবি ও কবিতার সংখ্যাধিক্য। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষে এসে আমরা অগণিত সংখ্যক কবির উপস্থিতি লক্ষ্য করছি এবং দেখতে পাচ্ছি অসংখ্য পত্রিকা ও সাহিত্য পত্রিকায় বিপুলহারে কবিতা ছাপা হচ্ছে। এরই বিপরীতে আবার দেখা যাচ্ছে যে কবিতা পাঠকপ্রিয়তা হারিয়েছে   মানুষ আগের মতো মনোযোগ সহকারে কবিতা পড়ছে না কিংবা বলা যায় কবিতার প্রতি মানুষের সেরকম মুগ্ধতা আর নেই। বিপুল সংখ্যক কবিতা প্রতি সপ্তাহে দৈনিক কাগজগুলোর সাহিত্য পাতায় এবং অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হচ্ছে, কবিতার গ্রন্থও প্রকাশিত হচ্ছে ব্যাপকহারে, কিন্তু মানুষ কবিতার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্য পাতায় ও অন্যান্য স্থানে প্রকাশিত কবিতাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে সাধারণ পাঠকরা তো বটেই, এমনকি কবিরাও স্বল্প সংখ্যক মুখচেনা কবির কবিতা একটু আধটু পড়ে, বাদবাকী কবিতায় একটুখানি চোখ বুলানো হয় মাত্র, অনেক সময়েই কেউ কেউ শুধুমাত্র কবির নাম এবং বড়ো জোর কবিতার শিরোনামটুকু পড়েন, এর বেশি পড়বার প্রয়োজন বোধ করেন না অথবা বলা যায় এসব কবিতা তাদেরকে টানে না, কিংবা তারা জানেন যে এসব কবিতায় নতুনত্ব বা চমৎকারিত্ব বলতে কিছুই পাওয়া যাবে না। এই চিত্র মোটেই স্বস্তিকর নয় এবং বাংলা কবিতা যে প্রকৃতপক্ষে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে এই সত্য লুকোবারও উপায় নেই। এই প্রবন্ধে কবিতার বিষয় আশয়, আঙ্গিক, প্রবণতা এবং সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং তারই প্রাসঙ্গিকতায় কবিতায় বহমান ধারাবাহিকতা, উত্তরাধিকার অথবা কাব্যভঙ্গির একমাত্রা থেকে আরেক মাত্রায় উপনীত হওয়ার ইতিহাসও  পরীক্ষা করা হবে।

বর্তমান সময়ে অনেকেই কবিতা সমন্ধে বলতে গিয়ে বলেন যে আধুনিক কবিতায় বিষয়ের উপস্থিতি জরুরি নয় এবং কবিতায় কোন প্রকার মেসেজ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। একথা ঠিক যে কবিতা ছন্দ ও অন্তমিলের বাঁধা ধরা নিয়ম কানুন থেকে মুক্ত হতে পেরে যথেচ্ছভাবে সৃষ্ট হওয়া বা বেড়ে ওঠার অবকাশ পেয়েছে। কিন্তু এটাও ভুললে চলবে না যে এর ফলে একটি অতিরিক্ত দায়িত্বও তৈরি হয়েছে, তা হলো কবিতা যেন কবিতা হয়ে ওঠে। এলোমেলো শব্দ সাজিয়ে কবিতার আদল দেওয়ার স্বাধীনতা যেমন কবিরা পেয়েছেন, তেমনি এদের মধ্য থেকে অকবিতা হিসেবে চিহ্নিত করে বাতিল ঘোষণা করার অধিকারটুকুও পাঠকের অন্ততঃ ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংরক্ষিত থাকছে। একথা ঠিক যে  কবিতা গণহারে মানুষের কাছে বোধগম্য হবে বা সমাদৃত হবে এমন আশা করা উচিৎ নয়, কিন্তু একই সঙ্গে ভুললে চলবে না যে শ্রেষ্ঠতম শিল্প হিসেবে কবিতার স্থান নির্দিষ্ট আছে বিধায়  যে কোন পর্যায়েই কবিতা যথার্থ, শুদ্ধ ও রসোত্তীর্ণ হওয়াটাও জরুরি।

কবিতার পাঠক প্রিয়তা হারানোর একটা প্রধান কারণ আমরা চিহ্নিত করি, তা হলো দুর্বোধ্যতা। কবি আসলে কী বলতে চান তা পাঠক গভীরভাবে চিন্তা করেও বের করতে না পারলে তাকে দুর্বোধ্য কবিতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে একজনের চেতনার জগৎ আরেক জনের চেতনার জগৎ থেকে অনেকখানি আলাদা। কাজেই কবি যখন তার অন্তঃকরণকে কয়েকটি পঙক্তির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন তখন অন্যের কাছে তা একই রকমভাবে ধরা দেবে এমনটা আশা করা যায় না কিন্তু কবিতা যেহেতু একটি শিল্প ছাড়া অন্য কিছু নয়, এবং কবিতা কবির স্বগতঃ উক্তিও নয়, সেহেতু কবিকে পঙক্তি বা বাক্য গঠনে সচেতন হতে হয় এবং দুর্বোধ্যতার পোশাক শরীরে চাপালেও তা যেন গ্রহণযোগ্য হয় এবং তার রস যেন আস্বাদনযোগ্য হয় সে খেয়ালও রাখতে হয়। কবিকে শুদ্ধ হতে হয় অন্তঃকরণের রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে। কবির অন্তঃকরণ কোন ক্রমেই পাগলের অন্তঃকরণ হিসেবে প্রকাশিত হতে পারে না, অর্থাৎ দুর্বোধ্যতা সে পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারে না যাকে প্রলাপ হিসেবে অভিহিত করা যায়।

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে আমাদের দেশে বর্তমানে কবির সংখ্যা অত্যধিক। এ বিষয়টিকে আমরা গুরত্ব সহকারে বিবেচনা করব। সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি-জীবনানন্দ দাশের এই উক্তিকে তো অগ্রাহ্য করা যায়ই না এবং ঠিক এ সময়ে এই কেউ কেউও প্রকৃতপক্ষে কবি কিনা কিংবা এদের সত্তার কত অংশ শুদ্ধতম কবি এবং কত অংশ মেকী বা নকল কবি ও তোতাপাখি সদৃশ্য বুলির কবি তাও খেয়াল করে দেখা দরকার। কবিতা যে পাঠকের কাছ থেকে সরে গেছে বা বোদ্ধা পাঠকও যে আস্থা হারাচ্ছে আধুনিক কবিতার উপর — এই সব নকল কবির কবিতা এরজন্য প্রধানত দায়ী। আমাদের জানতে হবে যে একজন কবি কবিতাকে কতখানি হৃদয় দিয়ে বুঝেছেন অথবা কতটা রপ্ত করেছেন কবিতার শৈলী। ঠিক এ প্রসঙ্গেই কেউ বলতে পারেন যে কবিতাকে যেহেতু কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ফেলা হয় না সেহেতু কবিতা হয়েছে কি হয়নি সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেয়া সম্ভব নয়। এবং এ ক্ষেত্রে সকলেরই অধিকার রয়েছে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার। এর উত্তরে বলতে হয় যে পরীক্ষা নিরীক্ষার অধিকার অবশ্যই আছে, কবিতার স্বরূপ নিয়ে সংজ্ঞা ও সংজ্ঞাহীনতারও অবকাশ যথেষ্টই রয়েছে, কিন্তু সবকিছুর পর কবির প্রধান দায়িত্ব হলো এই যে, কবিতাকে কবিতা হিসেবেই সৃষ্টি করতে হবে। বিধিনিষেধের দায়মুক্তি তার মধ্যে বরং আরো অধিক প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে কবিতাকে নতুনতর এবং সার্থক হিসেবে সৃষ্টি করে শেষ্ঠত্বের মালা পরানোর জন্য। কবিতার নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই — এই বাক্যের মূল উদ্দেশ্য হলো এই যে, কবির সামনে নতুন নতুন দিগন্তের উন্মোচন অপেক্ষমান, কবিকে সেইসব কিছু আবিষ্কার করে পাঠকের সামনে নতুনতর ও বৈচিত্রময় পেয়ালায় পরিবেশন করতে হবে। এর অর্থ কোন ক্রমেই এই নয় যে, কবিতাকে খেয়াল খুশিমতো ধ্বংসের পথে যাত্রা করাতে হবে। একেকজন কবি নিজ নিজ প্রজ্ঞা ও সামর্থ্য মতো কবিতাকে হৃদয়গ্রাহী, আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ করে সৃষ্টি করবেন তা বলাই বাহুল্য।

অতীতে যেমন, বর্তমানেও তেমনি প্রতিটি কবির সম্মুখে যে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আসে তা হলো কাব্যভাষা। কবিকে ঠিক করতে হয় কবিতার শরীর নির্মাণে যে ভাষাভঙ্গি ব্যবহার করবেন তা তেমন হবে। এক্ষেত্রে একই সময়ে একাধিক ধারা প্রবাহিত থাকতে দেখেন কবি। অনেকদিন ধরে চলে আসা ভাষাভঙ্গিতে কবিতা লেখার প্রবণতা যেমন তিনি দেখতে পান, আবার তেমনি দেখতে পান একেবারে সাম্প্রতিক সময়ের বিশেষত তরুণ কবিদের কাছে সমাদৃত খানিকটা পরিবর্তিত ও প্রায়শ অপেক্ষাকৃত জটিল ভাষাভঙ্গি। এবং এর বাইরে থাকে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী নতুন কাব্যভাষা। প্রতিভাবান কবি সাধারণত বিসর্জন ও অর্জনের মধ্য দিয়ে যেতে চান। এসব কিছুরই প্রেক্ষিতে আমরা অনেক রকম কবিতার দেখা পাই। কোন কবি হয়তো লেখেন পুরাতন ছন্দবদ্ধতা ও অন্তমিল দিয়ে, কোন কবি লেখেন আধুনিকতার লেবাস পরা গদ্যছন্দের ধারায়, কেউ কেউ লেখেন ছন্দ টন্দের চিন্তা মাথায় না এনে একেবারে নিজের তৈরি শিল্পের কাচামালের মতো করে। এভাবেই কবিতার একটি বৃহৎ সমাজ গড়ে ওঠে। নানা পদের নানা স্বাদের ও নানা বৈশিষ্টের কবিতা একই সময়ে সরগরম করে তুলতে পারে কাব্যের হাটবাজার ও রাজ্যপাটকে।

বাংলা কবিতার বর্তমান আঙ্গিক ও প্রকরণ পরীক্ষা করতে হলে এর পটভূমি বা পরিপ্রেক্ষিত সমন্ধে জানা দরকার। বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা লেখা ও চর্চার প্রাথমিক ক্ষেত্র ছিল পারিবারিক পরিমন্ডল। ঠাকুর পরিবার ছিল একটি ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান পরিবার। ইংরেজদের দ্বারা শাসনকৃত ভারতবর্ষে সেসময় যেমন বেগবান ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম, তেমনি আবার ছিল ইংরেজদের তোষণকারী এক শ্রেণির শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উত্থান। ইংরেজদের সমর্থন ও সহযোগিতায় এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির থেকে উদ্ভব ঘটে বেশ কিছু সফল ব্যক্তি বা পরিবারের যারা একই সঙ্গে ছিল ধনাঢ্য এবং সংস্কৃতবান। মুসলমান রাজা বাদশাহ কিংবা হিন্দু রাজাদের আদলে শিল্প সাহিত্যের চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতা না করে বরং ইউরোপীয় ধাঁচে জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্প সাহিত্য চর্চায় এরা অধিক উৎসাহী হয়ে ওঠে। এরূপ পটভূমিতে ঠাকুর পরিবারে শিল্প ও সাহিত্য চর্চার অনুকূল পরিবেশে রবীন্দ্রনাথের কবিতা লেখা শুরু হয়। ঠাকুর বাড়ির সদস্যদের সম্পাদনায় সে সময় একাধিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতো এবং রবীন্দ্রনাথের লেখালেখি এরূপ পরিবেশে ও এসমস্ত পত্র পত্রিকার মাধ্যমেই প্রসারিত হতে থাকে। এরই মধ্যে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে বিলাত গমন করেন এবং ইংল্যান্ডের বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকের রচনা এ সময়ে তার মননে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও অন্যান্য প্রাচীন ও রোমান্টিক ধারার কবির কবিতা এবং একই সঙ্গে পারিবারিক নরম কোমল পরিবেশে সাহিত্য চর্চার অবাধ সুযোগ তার কাব্য ভঙ্গিকে অনেকটাই নির্দিষ্ট করে দেয়। এই রোমান্টিকতার ধারা তার প্রথম দিককার কবিতায় যেমন, তেমনি তার পরবর্তিকালের কবিতাতেও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিরাজ করে। পরবর্তিকালে বাংলার প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে রবীন্দ্রনাথ বিশালতার দীক্ষা লাভ করেন এবং প্রকৃতির এই অকৃপণ দানকে স্বার্থকভাবে কবিতায় ধরে রাখতে সমর্থ হন। তার কবিতার মূল প্রবণতা যে রোমান্টিকতা, বাস্তবকে ঈশ্বরের পায়ে বিলিয়ে দেওয়া এবং দ্রোহ ও বিপ্লবী চেতনার পরিবর্তে নম্র ও বিশ্বাসী ভঙ্গিমাÑ এই ধারা বিপুলভাবে জনপ্রিয় হওয়াতে এবং তৎকালীন প্রায় সকল কবি সেই মতো কবিতা রচনা করতে থাকলে বাংলা কবিতায় এক ধরণের স্থায়ী স্থবিরতার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। তিরিশের কবিগণ এই স্থবিরতার ক্ষেত্র থেকে বের হওয়ার জন্য প্রত্যয়ী হন এবং বাংলা কবিতার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক-প্রকরণকে সমসাময়িক ইংরেজি, ফরাসি ও অন্যান্য ভাষার কবিতার সঙ্গে সমানতালে পা ফেলার উপযোগী করে তুলতে চেষ্টা চালান।

মূলত তিরিশের কবিরাই কবিতার আঙ্গিককে আমূল পরিবর্তনের পথে যাত্রা করান। সেই সময় থেকে আজ অবধি কবিতা প্রাচীনত্বের ভঙ্গি ত্যাগ করে সমকালের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিকে আলিঙ্গন করেছে। এই প্রকাশভঙ্গিটিকে আমরা সহজেই সণাক্ত করতে পারছি। তিরিশের প্রধান কবিদের প্রায় সকলেই ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও পরবর্তিতে শিক্ষক। তাদের ধ্যান-জ্ঞানে পাশ্চাত্বের চিন্তাধারা প্রবলভাবে ঢুকে গিয়েছিল এবং তা থেকে মুক্ত হয়ে কবিতা লেখার প্রয়াস তারা মোটেই করেননি। অর্থাৎ বলা যায় তারা জানালা দরজা খোলা রেখেছিলেন যাতে করে একই ঘরে দেশি ও বিদেশি সকল কবিতা এসে মিলিত হতে পারে। এর সুফল ও কুফল উভয়ই আমরা পরবর্তিকালের কবিতায় টের পাই। তিরিশের পরবর্তিকালের কবিগণ তিরিশের পঞ্চপান্ডবকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং দেখা যায় খুব একটা মৌলিক পরিবর্তনের দিকে তারা যাননি। বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তনের ঢেউ এসময়কার কবিতাতেও ভালই এসে লাগে। সমাজতন্ত্রের বিজয়লাভের ঘটনা বাংলা কবিতায় নতুন স্রোত আনয়ন করে। কবিতায় জীবনমুখীতা ও রাজনীতি বিশেষ স্থান দখল করে এবং শুধুই নিবেদনমূলক কিংবা বিনোদনমূলক পঙক্তিমালা নয় বরং অনেক সময়ই কবিতা প্রয়োজনের সংলাপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এর বাইরে কবিতার ভাষাভঙ্গি প্রায় একইরকম থাকে এবং কাব্যভাষার প্রাচীন ভঙ্গিকে পরিত্যাগ করে আধুনিকতার পক্ষে থাকার কারণে নতুন কবিকে বিশেষ উদ্বিগ্ন হতে হয় না কাব্যভাষার ব্যাপারে।

কিন্তু এ পর্যায়ে এবং পরবর্তিতেও যা প্রধান ও মারাত্মক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে বরং অনুদঘাটিত কিংবা প্রশ্নের বাইরেই থাকে যায় তা হলো পাশ্চাত্ব্যের অন্ধ অনুকরণ। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল থেকে সরে এসে আমাদের কবিগণ বোদলেয়ার র‌্যাবো এলিয়ট প্রমূখের প্রেমে এতটাই মুগ্ধ ও নিমজ্জিত হন যে অকাতরে নিজেদের কবিতাও সেরকমভাবে নির্মাণ করতে থাকেন। এ সমস্ত বিদেশি কবির ব্যবহৃত উপমাগুলিই আমাদের দেশের কবিগণ ব্যবহার করতে থাকেন, অনেকে খানিকটা ঘুরিয়ে ফিরেয়ে রেখে ঢেকে, আবার অনেকেই একেবারে আক্ষরিক অনুবাদের মতো করে। অনেক বিখ্যাত ও ভালোলাগার আবেশময় কবিতার বহু পঙক্তিই আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বিদেশি কবিতার হুবুহু অনুবাদ অথবা ভাবানুবাদ মাত্র। এটি একটি আত্মঘাতী প্রবণতা এবং তা পরবর্তি কবিদের সৃষ্টিশীলতাকে শুকিয়ে মৃত করে ফেলে। অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা না করে অন্যের লিখিত কবিতার থেকে ভাব ও বিষয় ধার করার মতো নষ্ট পরিবেশ তৈরিতে এই প্রবণতা সহায়ক হয়ে দেখা দেয়। এরই বিরূপ ফলাফল আমরা দেখতে পাই আজকের অসংখ্য কবির মধ্যে। এদের মানসিকতাই এমন যে অন্যের লেখার মতো করে কবিতা রচনার বাইরে  এরা যেতে পারে না। এদের বেশির ভাগই আবার ইংরেজি সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম নয়, ফলত এরা পশ্চিমবঙ্গের  সমসাময়িক প্রতিষ্ঠিত কবিদের কবিতার ভঙ্গি অনুকরণ করেন এবং নিজের দেশে নির্বিচারে একে অন্যের মতো করে কবিতা রচনা করেন। ফলে বহুজনের কবিতাকে মনে হয় একেবারে কাছাকাছি ভঙ্গির একটিই কবিতা।

রবীন্দ্র বলয় থেকে মুক্ত হতে গিয়ে ত্রিশের কবিগণ বিদেশি কবিতার প্রভাব আচ্ছাদিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু একই সঙ্গে তারা নিজেদের মেধা, শানিত চেতনা, স্বদেশপ্রেম ও মানবিকতাকেও কবিতায় উজ্জ্বল করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন, যে কারণে পরবর্তি কবিগণ তাদের সৃষ্ট কাব্যভাষার পথকে পরিত্যাগ করেননি, সে পথ ধরেই অনেক কবি স্বকীয়তার প্রকাশকে অনবদ্য করে তুলতে পেরেছেন, বাংলা কবিতার অঙ্গনে তাদেরকে উপযুক্ত আসন দিতে কারোরই কুণ্ঠা নেই। কিন্তু এদের সংখ্যা নেহাতই অল্প এবং দেখা গেছে যে এরকম কয়েকজন কবির মৃত্যুর পর প্রকৃতই বাংলা কবিতার ভূখন্ডে দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। কালে কালে কবিতার প্রতিবেশ ও পরিবেশ  জটিলতর হয়েছে এবং  ঠিক এই সময়ে আমরা নতুন মেধাবী ও শক্তিমান কবির আবির্ভাব ঘটতে দেখতে পাচ্ছি না একবারেই।

বর্তমানে কবিতার অঙ্গনে একধরণের পরিকল্পিত স্বেচ্ছাচারিতার জয়জয়াকার চলছে এবং গোষ্ঠীবদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও অন্যান্য সামর্থের প্রয়োগ ঘটিয়ে অনেক কবিই নিজেকে বহূল প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত করে ফেলছেন স্বল্প সময়েই। এর ফলে কবিতা যে শুধু খেয়াল খুশিমতো লেখার বিষয় নয় বরং মেধা মনন ও সাধনার মিলিত নির্যাস এই সত্য অনেকেই ভুলতে বসেছেন। এরই পটভূমিতে দেখা যাচ্ছে বর্তমানের তরুণ কবিরা ছন্দ ও অন্তমিলকে কবিতা থেকে এক রকম বাদই দিয়েছেন। গদ্যছন্দে লেখার অভ্যাস থেকে ক্রমে ছন্দহীনতার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন কবিরা এবং তাদের এই স্বাধীনতার অপব্যবহার স্বেচ্ছাচারিতার জন্ম দিয়েছে কবিতা রচনার ক্ষেত্রে। এরই সঙ্গে যোগ হয়েছে অকবির সৃষ্ট অকবিতার ঝলকানি। যিনি অকবি তিনি অকবিতাই লিখবেন এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এখানে তৈরি হয়েছে একধরণের প্রত্যাশার পরিবেশÑ অর্থাৎ আমরা কবিতার অপার সম্ভাবনার ব্যাপারে প্রায়শই আশাবাদী হতে ভালোবাসি এবং অনেক সময়ই ভাবি যে নতুনতর আঙ্গিক ও পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এ সমস্ত কবিদের মধ্য থেকে কেউ কেউ হয়তোবা যথার্থই ভালো কিছু সৃষ্টি করবেন। কিন্তু ইতিমধ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আগাছা বেড়ে গেছে অত্যধিক এবং এ সমস্ত আগাছা কবিতার বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেতকে ধ্বংস করে ফেলার উপক্রম করেছে। এ সকল আগাছা কবিতা আবার ব্যবহৃত হচ্ছে ওয়ানটাইম ব্যবহারের বস্তুর মতো করে। এবং এসব কবিও ঠিক এমনটাই চাচ্ছেন। অর্থাৎ পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে বুঝে সুঝেই এই ওয়ানটাইম ব্যবহারের মতো করেই কবিতা লিখছেন এ সমস্ত কবিরা এবং নাম যশও ভালই কামাচ্ছেন। এসব কবিতার রচয়িতার মূল লক্ষ্য হলো সৃষ্ট কবিতাটি কোন একটি ভালো পত্রিকায় ছাপানো।

এ সমস্ত কবিতাই এখন আমরা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় বেশি দেখতে পাচ্ছি। আমরা এও দেখছি যে পাঠক এসব কবিতায় একবার চোখ বুলান, অবশ্যই চমৎকৃত হন এর শব্দরাজির ঝলকানিতে, আর খুবই স্বাভাবিকভাবে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কবিতাটি ভুলে যান। অর্থাৎ এ সকল কবিতা লেখা হচ্ছে আড়ম্বর সহকারে, কোথাও না কোথাও ছাপাও হচ্ছে সাড়ম্বরে, এবং ছাপা হওয়ার পরপরই পাঠকের কাছে তার মৃত্যু ঘটছে। এ সমস্ত কবিতা কেউ হৃদয় ও মগজে সংরক্ষণ করছে না। নামী দামী পত্রিকায় ছাপা হওয়ার কারণে বড়জোর কবির নামটি পাঠক স্মরণে রাখছেন এবং এরই ফলে এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার এইরূপ ইমেজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন যে, অমুক কবির কবিতা অর্থই  এরকম বা সেরকম কবিতা, তা পড়াও যা না পড়াও তা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রতিষ্ঠিত কবি এবং তরুণ কবিদের মধ্যে অনেকেই এরকম ইমেজের অধিকারী হয়ে পড়েছেন। এদের কবিতা অহরহ ছাপা হচ্ছে, পাঠক তাতে চোখ বুলিয়ে কিছুই পাচ্ছেন না, শেষে কবিতার সঙ্গে সঙ্গে কবির নামটিও সাদা কাগজে ঢেকে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।  দশকের শুরুতে যে কবি মহা দাপটে চলেছেন পরের দশকে তার আর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এদের মধ্যে অনেকেই আবার পত্রিকায় চাকরি পেয়ে সাহিত্য পাতা সম্পদনার দায়িত্ব পালন করছেন, কিংবা কেউ কেউ বের করছেন ঢাউস আকারের লিটল ম্যাগাজিন, ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের কবিতা যে দুষ্টচক্রের হাতে পড়ে মার খাচ্ছে তা না বললেও চলে।

কবিতার প্রতি মানুষের ভালোবাসা, প্রাণের টান ও প্রত্যাশা অনেক পুরোনো, তা সহসাই শেষ হবে এমন মনে করার কারণ নেই। মানুষের মননের চাহিদা পূরণে পূর্বে কবিতাই ছিল অদ্বিতীয়, বর্তমানে চিত্তবিনোদন এবং বিনোদনের পাশাপাশি জ্ঞানার্জনের বহু উপকরণের উপস্থিতি হেতু কবিতাকে অনেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে কিন্তু তারা প্রকৃতপক্ষে সস্তা বিনোদনের ফাঁদে পড়েছে এবং মননের গভীর প্রদেশে বঞ্চিত হচ্ছে একথা বলাই বাহুল্য। এই শ্রেণির মানুষেরই মতো এক শ্রেণির কবি আমরা দেখতে পাচ্ছি যারা চটকদার বিজ্ঞাপন, ধূমধারাক্কা শিকড়হীন সংগীত এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিত অন্যান্য সহজলভ্য ও এলেবেলে এলেমেলো বিষয়ের সঙ্গে এক করে কবিতাকে বিবেচনা করছে। ফলে এদের কবিতায় অসংলগ্নতা, কৃত্রিম জৌলুস ও ভাবের অগভীরতা প্রকটভাবে ফুটে উঠছে। অনেকে আবার কবিতার সমৃদ্ধ অতীত সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ এবং ছন্দ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা যেমন নেই তেমনি আবার কবিতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিৎ এ ব্যাপারেও সামান্য ভাবনা চিন্তা করে বলে মনে হয় না। কবিতা যে হৃদয়ের গভীরে ঝংকৃত হওয়ার জন্য সৃষ্ট হয় এবং একাকিত্ব কিংবা কোলাহলময়তার মধ্যেও তা হৃদয়ে বার বার ঝংকৃত হতে থাকে, এজন্য অনেক দীর্ঘ কবিতাও সহজে মুখস্থ হওয়ার উপযোগি হিসেবেই সৃষ্ট হয়, এসব সত্য জানা ও উপলদ্ধির পরই কেবল ভালো কবিতা লেখা সম্ভব। ভালো কবিতা লেখার জন্য ছন্দ ও অলঙ্কার সমন্ধে অবশ্যই জ্ঞান থাকতে হবে। বহু বিষয়ে সম্যক ধারণা বা জ্ঞানের সুসমন্বিত সমাবেশ আর সেই সঙ্গে সমৃদ্ধ কল্পনা শক্তির প্রয়োগ, পরিমিতিবোধ, মহত্তম ও উজ্জ্বলতম কবিতা সৃষ্টির জন্য মনের গভীর থেকে উৎসাড়িত তাড়ণাÑ এসব কিছুই একজন কবির জন্য বেশি প্রয়োজন। ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ, স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বজনীনতা, সেই সঙ্গে আগামীকে যথাযথভাবে উপলদ্ধি ও আগামীর ভালোত্বকে আলিঙ্গন করার মধ্যেই কবির সফলতার বীজ লুকায়িত। সংকীর্ণতা, সস্তা প্রচারের যৎসামান্য প্রাপ্তীর আত্মপ্রসাদ ও গোষ্ঠীবদ্ধতা থেকে মুক্ত হওয়াও সর্বাগ্রে প্রয়োজন। কবির সবচেয়ে বড়ো আনন্দ কবিতা রচনায়-একটি স্বার্থক কবিতা এই আনন্দকে দিতে পারে সময়কে অতিক্রম করার চাবিকাঠি। বাংলা কবিতা সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে দিনকে দিন এগিয়ে যাবে স্বমহিমায়, এই প্রত্যাশার কাছে কবিরা অবশ্যই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


About The Author

admin

সংবাদের ব্যাপারে আমরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাস করি।বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনায়। আমাদের প্রত্যাশা একাত্তরের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশের পর্যায়ে।

Number of Entries : 7529

Leave a Comment

সম্পাদক : সুজন হালদার, প্রকাশক শিহাব বাহাদুর কতৃক ৭৪ কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। ফোনঃ 02-9669617 e-mail: info@visionnews24.com
Design & Developed by Dhaka CenterNIC IT Limited
Scroll to top