ফরিদুজ্জামানের কবিতা : বিশেষত্বের বিশ্লেষণ Reviewed by Momizat on . ইয়াসির আজিজ কবিতায় কবির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটিকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। করা উচিৎও নয়, বিশেষ করে ইদানিংকার বাস্তবতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিত ইয়াসির আজিজ কবিতায় কবির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটিকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। করা উচিৎও নয়, বিশেষ করে ইদানিংকার বাস্তবতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিত Rating: 0
You Are Here: Home » কালস্রোত » ফরিদুজ্জামানের কবিতা : বিশেষত্বের বিশ্লেষণ

ফরিদুজ্জামানের কবিতা : বিশেষত্বের বিশ্লেষণ

ইয়াসির আজিজ

কবিতায় কবির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটিকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। করা উচিৎও নয়, বিশেষ করে ইদানিংকার বাস্তবতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তেমনই কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা কাজী নজরুল ইসলামেরই মতো। কাজী নজরুল ইসলাম যদি রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষার মতো করে নিজের সৃষ্টিকে এগিয়ে নিতেন তবে তাাঁকে অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়তে হতো। সমকালীন বাংলা কবিতায় একটা অবক্ষয়ের পালা চলছে- দেখা যায় অসংখ্য কবির কবিতা প্রায় একই রকমের। ভাব ও ভাবনা, লক্ষ্য ও নির্মিতি এতই বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়েছে যে অনিচ্ছাকৃত হলেও নকলের দায় এড়াতে পারছেন না বহু কবি। প্রকটভাবে কবিতা হয়ে উঠেছে গন্তব্যহীন ও ক্লিশে। এই নষ্ট স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটছেন কিছু সংখ্যক কবি- হয়তো তাদের সস্তা জনপ্রিয়তা জুটছে না, হয়তো তারা মিডিয়া দখলের হাস্যকর ইঁদুর দৌড়ে সামিল নন, তবু অনুসন্ধানী বোদ্ধা পাঠকের ভালোবাসা তারা ঠিকই পান। নিরপেক্ষ সমালোচকও এঁদেরকে যোগ্য মর্যাদা না দিয়ে পারেন না।

কবি ফরিদুজ্জামানের কবিতা নিয়ে আলোচনার শুরুতে উপরের কথাগুলো খুবই প্রাসংগিক। আমরা দেখতে পাই যে ফরিদুজ্জামান প্রায় তিন দশক ধরে কবিতা চর্চায় নিয়োজিত এবং কোন প্রকার মোহ বা আপাত চাকচিক্য তার কবিতা স্রোতকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারেনি।

একজন প্রকৃত কবিকে ধারণ করতে হয় হাজার বছরের প্রবহমান স্রোতকে। অতীতকে আত্মস্থ করেই তিনি লেখেন বর্তমানের ভাষায়। ভবিষ্যতের আকাশটিও তিনি তার কবিতায় ধরে রাখতে ভুল করেন না। অনেক অনেক রক্ত, হিরে মানিক্যের উজ্জ্বলতায় নিজেকে জানান দেন এক একটি কালোত্তীর্ণ কবিতায়। একজন কবির সারা জীবনের সাধনা থাকে নতুন নতুন কবিতায় সেই উজ্জ্বলতা ফুটিয়ে তোলার। ফরিদুজ্জামানের মননে আমরা দেখতে পাই সেই সাধনার অভিলাসকে। সমগ্র সত্তা দিয়ে তিনি যেন গড়েন তার কাব্য প্রতিমাগুলোকে। তার ভেতরকার কোন গভীর গহ্বর থেকে যেন উঠে আসে শব্দমালা। চেতনার রৌদ্রে সেগুলো উদ্ভাসিত হয়। উচ্চারিত পঙক্তিমালা তৈরী করে এক ধরণের ঘোর, কবি সেই আরাধ্য ঘোরের ভেতর চলাফেরা করতেই বেশি পছন্দ করেন। এই ঘোরের সঙ্গে পরিচয় ও পরিণয় সূত্রে তৈরি হয় নবতর চেতণার ভূমি, এটি অন্য সকল কিছুর সঙ্গে এক ধরণের পার্থক্যও রচণা করে দেয়। কবির কবিতা থেকেই এভাবে বলা যেতে পারে-

’মাধবী লতার আঁকশি তুমি উৎকর্ষের

সিঁড়ি বেয়ে ঊর্দ্ধমুখে বেড়ে চলছো

আর আমি কাঁধের ওপর জীবনের

ভারে অবলম্বনহীন।

(আশা কেলাশন / জ্যোৎসনা জলের টানে)

ফরিদুজ্জামানের প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা সাত। কোন বিশেষ বই থেকে নয়, কবির সমস্ত সৃষিাট সম্ভার থেকে আমরা তার কবিতার একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের প্রয়াস পাব। আগ্রহী পাঠককে জানানো দরকার যে, দশক বিচারে ফরিদুজ্জামান নব্বই দশকের কবি। তার কাব্যভাষায় এই সময়কাল পুরোপুরি প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, হয়তো আংশিক পেরেছে, তারচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে দেখা যাবে অঞ্চলগত উচ্চারণের টান ও গ্রামীণ জীবন যাত্রার পটভূমি। একটু বেশিমাত্রায় স্মার্টনেস, যা নব্বই দশকের কবিদের উত্তরাধুনিক অভিধার দিকে এগিয়ে দিয়েছে, ফরিদুজ্জামান তা পুরোপুরি পরিহার করেছেন। তিনি বরং অভিজ্ঞতা ও উপলব্দির দিকে জোর দিয়েছেন। যে কোন বিষয়কে কবিতা আকারে উপস্থাপিত করার একটা সহজাত প্রবণতাও দেখা যায় তার মধ্যে। সেই বিষয়টি হতে পারে কোন ঐতিহাসিক ঘটণা বা স্থান, কিংবা কোন ব্যক্তি, হতে পারে অতীত স্মৃতির রোমন্থন, হতে পারে প্রকৃতি ও স্বদেশ। এই ধরণটি আমরা দেখতে পেতাম স্বভাবকবি বা গ্রাম্যকবির মধ্যে। কোন চিত্তাকর্ষক ঘটনাকে কবিতা বানিয়ে গ্রাম্যকবি বা চারণকবি তা বিলি করতেন গ্রামের হাটবাজার, রেল স্টেশন বা রেলগাড়ির কামরায়। এতে যদিও তার কিছু আর্থিক প্রাপ্তির ব্যাপার থাকতো তবু তার কবি সত্তাকে কেউ অস্বীকার করতে পারতো না। ছন্দ ও অন্তমিলে দোলানো সেই সব কবিতা সাধারণ মানুষ আগ্রহ নিয়ে শুনতো। মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে সে সব কবি ও কবিতা আমরা আর দেখতে পাই না- কবিতা আধুনিক ও আধুনিকতর হতে হতে অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরাচারীর রূপ নিয়েছে। ফরিদুজ্জামন তার কবিতাকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে নিয়ে যাবার মতো করে তৈরি করেছেন নাকি একান্তই নিজের সত্ত্বার সঙ্গে নিজেরই ভাষায় কথা বলার মত করে গড়েছেন তা হঠাৎ করে সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। তার কবিতায় সহজতা আছে, মানুষের বুদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ না করে কবিতার স্বাদকে গ্রহণ করানোর ক্ষমতা রয়েছে তার, এবং প্রাচীণ পুঁথিরচয়িতাদের মতোই অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সংমিশ্রণ ঘটানোর রসায়ন রয়েছে তার দখলে।‘কবিতা এক ধরণের টেকনিক’- তিনি এটা অবশ্যই মানেন এবং রপ্তও করেছেন, কিন্তু তিনি সময়ের ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে, হঠাৎ করে ডিজিটাল কবিতার আবর্তে পড়েনি তার কাব্যভাষা। ফলে তার কবিতায় কখনো কখনো ত্রিশের কবিতার ছায়া দেখে ফেলতে পারি কিংবা বারও আগের কোন প্রাচীণতা উত্তেজক ভঙ্গিমায় দেহলতা প্রদর্শন করতে পারে, কিন্তু সেই একই কবিতায় তিনি নিজেকে ও পাঠককে জলে ডুবান না ফিরিয়ে আনেন বর্তমান সময়ের কূলে। এই বৈশিষ্ট্যটি তাকে আলাদাভাবে চেনবার সুযোগ করে দিয়েছে- যারা তার কবিতার সঙ্গে পরিচিত তারা জানেন যে নব্বই দশকের আর দশটা কবির কবিতা ঠিক এ রকম ভঙিতে বেড়ে ওঠার উঠোন খুঁজে পায়নি। ‘নিরীক্ষাই শেষ কথা নয় কবিকে ফিরতে হয় নিজেরই আদিম সত্বার কাছে, বারবার জন্মাবার অভিপ্রায়েএকই শ্যামল স্বদেশভূমিকে আকাশে সকল শূন্যস্তরে চিনে নেয়ার ক্ষমতা থাকতে হয়’- এরকম কোন সত্য তিনি উপলব্দি করেন তার কবিতার ভূমিতে দাঁড়িয়ে।

কবিতা এমন একটি শিল্প যেখানে তার নিজস্ব ব্যাকরণগুলোকে সহজেই সনাক্ত করা যায়। ভালো কবিতায় উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প ও ছন্দের মত অলংকারগুলো বারবার ব্যবহৃত হয়। বক্তব্যকে ছাপিয়ে এইসব অলঙকার কবিতায় নিয়ে আসে মাধুর্য। ফলে কবিতা হয় সুখপাঠ্য এবং এক ধরণের প্রশান্তি মেলে ভালো কবিতা থেকে। আমরা এখন ফরিদুজ্জামানের বিষয়-আশয় ও অলংকারগুলোর উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করব।

ফরিদুজ্জামানের কবিতায় বস্তু প্রাধাণ্য পেয়েছে তার পূর্বাপর অক্ষুন্ন রেখে। তিনি যখন চাঁদকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন তখনও তিনি সুন্দরী নারীর প্রতি প্রেমে অন্ধ হয়ে ভুলে যাননি জ্যোৎসনার নিজস্ব অভিধানকে। বরং তিনি জ্যোৎসনা ও জলকে মিলিত করে তৈরি করেছেন নতুন প্রকল্প, যার ফলে ‘জ্যোৎসনা জলের টান’ এর মতো বিশেষ ব্যঞ্জনা আমরা পাই তার কাছ থেকে। এই বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে অজস্র কবিতায় আবর্তিত হয়েছে ভাবনা ও আবেগের সুষমা। খানিকটা উদ্ধৃতি দিয়ে দেখানো যাক-

’দৃশ্যান্তরে বোধন বদল হয়

পাটনা ও লক্ষৌর বাঈজীরা হাত ধরে নাচে

পানিপথে যুদ্ধের দামামায় জেগে উঠি

আলগিড়ে সুফির ধমকে থমকে দাঁড়াই।

দৃশ্যান্তরে বোধন বদল হয়

রাজঘাটে চিতাখোলার নীলশিখা

অহিংসের বাণী শোনায়।’

(দীপশিখা/ জ্যোৎসনা জলের টানে)

কবিতায় ঐতিহাসিক সত্যকে উপযুক্ত মর্যদা দিতে তিনি কার্পণ্য করেন না। তার স্বদেশপ্রেম ও নতুনতর উপলব্দি স্থান কাল পাত্রের সঙ্গে একাত্ম ঘোষণা করে। কবি অনেক সময়ই পর্যটকের চোখ দিয়ে দেখেন এইসব বস্তুকে। কলকাতায়, দিল্লিতে অথবা আগ্রায় তিনি এক বিমোহিত পর্যটক হয়ে সেই কোন কালের রাজা বাদশাহের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেন গভীরতর বোধের পঙক্তিমালা। তিনি কুর্নিশ করেন ইতিহাসের সেইসব নায়কদের। আবার ফিরে দেখেন একেবারে প্রান্তবর্তী মানুষদের আকাক্সক্ষাকেও। তার একটি কবিতার ক’টি পঙক্তি এরকম-

‘দিল্লী ভ্রমণের আরম্ভকালে বাবা বলেছিলেন:

দেখিসতো ইন্ডিয়া গেটের ফলকে

বাঙাল মুল্লুকের মকবুলের লেখা নাম মুছে গেছে কিনা।

তিন পুরুষের আবেগ বর্ণনায় আমার কলম অপারগ।’

(অমর কবিতা/নিসর্গে নীল গান)

এভাবে বারবারই ইতিহাস ও যুদ্ধ প্রসঙ্গ এসেছে। কবিতায় তিনি যেন স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে যুদ্ধের অপরিহার্যতাকে। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাঙালীর বীরত্বগাঁথাকে তিনি বর্ণনা করেছেন সোজাসাপটাভাবে, ঘুমঘুম কাব্যিকতাকে তিনি এসব কবিতায় দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি আবিষ্কার করেছেন এই বোধের চিত্রকে-

’কালের দেয়ালে কতো ভুল ছবি ঝুলে আছে

কতো টিকটিকির লেজ আস্ফালন করতে করতে ঝরে গেছে

কতো আজাদী ঝুটা হয়ে গেছে ইত্যাকার সব

পাখি বলে অবিরাম।’

(আমার কুর্ণিশগুলো/ নিসর্গে নীল গান)

আমরা দেখতে পাই স্বদেশ প্রেমের চেতনার মশাল জ্বেলে তিনি যেমন ইতিহাসের গলি থেকে রাজপথে ভ্রমণ করেছেন তেমনি আবার লীন হয়েছেন প্রকৃতিতেও। বিশেষ করে গ্রাম্যপ্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবন তিনি রোপন করেছেন তার কবিতার ক্ষেত-খামারে। নস্টালজিয়ার অবকাশ যেমন আছে তেমনি আবার সময়ের কালোছায়ায় মিশে থাকার আক্ষেপও আছে। তার শৈশবের প্রিয় নদী ’কুমার নদ’ মৃতপ্রায়- যান্ত্রিকতার অগ্রযাত্রায় দীর্ঘকালে সংস্কৃতি ও মূল্যবোধগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, এই বেদনাবোধ তিনি ধরে রেখেছেন বেশ কিছু কবিতায়।


About The Author

admin

সংবাদের ব্যাপারে আমরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাস করি।বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনায়। আমাদের প্রত্যাশা একাত্তরের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশের পর্যায়ে।

Number of Entries : 7529

Leave a Comment

সম্পাদক : সুজন হালদার, প্রকাশক শিহাব বাহাদুর কতৃক ৭৪ কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। ফোনঃ 02-9669617 e-mail: info@visionnews24.com
Design & Developed by Dhaka CenterNIC IT Limited
Scroll to top