জীবনানন্দ দাশের কবিতা: অন্তর্জগতের রঙ Reviewed by Momizat on .   ইয়াসির আজিজ কবি জীবনানন্দ দাশকে হৃদয়ের গভীর প্রদেশে অধিষ্ঠিত করে যেভাবে পাঠ করা যায়- সেভাবে অনেক বড় কবিকে পাঠ করা যায় না। জীবনানন্দের কবিতা আমাদের বোধকে   ইয়াসির আজিজ কবি জীবনানন্দ দাশকে হৃদয়ের গভীর প্রদেশে অধিষ্ঠিত করে যেভাবে পাঠ করা যায়- সেভাবে অনেক বড় কবিকে পাঠ করা যায় না। জীবনানন্দের কবিতা আমাদের বোধকে Rating: 0
You Are Here: Home » slider » জীবনানন্দ দাশের কবিতা: অন্তর্জগতের রঙ

জীবনানন্দ দাশের কবিতা: অন্তর্জগতের রঙ

জীবনানন্দ দাশের কবিতা: অন্তর্জগতের রঙ

 

ইয়াসির আজিজ

কবি জীবনানন্দ দাশকে হৃদয়ের গভীর প্রদেশে অধিষ্ঠিত করে যেভাবে পাঠ করা যায়- সেভাবে অনেক বড় কবিকে পাঠ করা যায় না। জীবনানন্দের কবিতা আমাদের বোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে চায়, তখন আমাদের ভেতরটা সচেতন হয়ে তার কবিতার স্বরূপকে বুঝে নিতে ধরে, এইভাবেই জীবনানন্দের কবিতা পাঠ সময়ের পরিক্রমায় ক্রমশই উজ্জ্বল হয়েছে।

জীবনানন্দের কবিতায় প্রেমকে চিহ্নিত করতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি যে, তার অধিকাংশ কবিতাই প্রেমের কবিতা। প্রেমই তার একমাত্র অবলম্বন- যার শক্তিতে তিনি রচনা করতে পেরেছেন কয়েক’শ সার্থক কবিতা। প্রেম কেন তার একমাত্র অবলম্বন এই প্রশ্নের উত্তরে ব্যক্তি জীবনানন্দের সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে হবে। কবি জীবনানন্দকে আলাদা করে সরিয়ে নিলে ব্যক্তি জীবনানন্দ ছিলেন একজন অসফল ও উদ্বিগ্ন ধরনের মানুষ। কর্মক্ষেত্র তাকে নির্নমভাবে ঠকিয়েছে। তার সময়কার অনেক কবিই যখন অধ্যাপনা, লেখালেখি ও নানাবিধ কর্মকা-ের মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত, তখন তিনি চাকুরীস্থলে সামান্য কারণে কিংবা একেবারেই বিনা বরেণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন, দন্ডিত হয়েছেন, পদচ্যুত হয়েছেন বা স্পষ্টভাবে বললে বলা যায় বিতাড়িত হয়েছেন প্রতিষ্ঠার যে কোন বৃত্ত ও বলয় থেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক অশান্তি। স্ত্রীর কাছ থেকে যথার্থ সমর্থন তিনি কখনোই পাননি, তার স্ত্রীর আকর্ষণ ছিল তার কবিকৃতির চেয়ে অন্য কিছুর প্রতি। এরকমভাবে নানা বিপন্নতা তাকে ঘিরে ধরে, ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে, তাকে প্রায়শ স্থানচ্যুত করে। এই স্থানচ্যুতিকেই তিনি ভিন্ন আবহ তৈরিতে কাজে লাগাতে সমর্থ হন, যার ফলে তার কবিসত্ত্বা অন্যদের চেয়ে প্রবলভাবে আলাদারূপে প্রস্ফুটিত হয়, তিনি চিহ্নিত হন একেবারেই ভিন্ন সুরের কবি হিসেবে।

Jibonanondo Das

কবি জীবনানন্দ দাশ ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মেছেন একই সালে। জীবনানন্দের শুরুর দিকের কবিতায় নজরুলের কবিতার ভঙ্গি লক্ষ করা যায়। কিন্তু খুব বেশি সময় নেননি জীবনানন্দ নজরুল থেকে সরে আসতে বা আলাদা হতে। জীবনানন্দের ঝরাপালক কাব্যগ্রন্থে আমরা নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথের ছায়া দেখতে পাই, মনে হওয়া অসম্ভব নয় যে একজন জীবনানন্দ চারজন কবির আত্মা হয়ে ধ্বনিত হচ্ছেন, এই চারজন কবির মধ্যে তিনজনকে পেছনে ফেলে চতুর্থজন অর্থাৎ জীবনানন্দ নিজেকে আলাদভাবে পুরোপুরি মেলে ধরলেন ধূসর পান্ডুলিপি কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে। এর আগে ঝরাপালক কাব্যগ্রন্থে তিনি সমসাময়িক কালকে সম্মান জানিয়ে সেই কালের সুরেই নিজেকে হাজির করেছেন পাঠকের দরবারে, যদিও সেখানেও তার ভিন্ন  উচ্চারণগুলো খুব বেশি প্রচ্ছন্ন থাকেনি। ধূসর পান্ডুলিপিতে একেবারেই আলাদা ধাঁচের এক কবিসত্ত্বার দেখা পেল সেই সময়কার পাঠকেরা। বলা বাহুল্য যে পাঠকের প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেল মিশ্র ধরণের। নতুনকে বুঝে ওঠা ও বরণ করে নেওয়ার মতো মানুষের অভাব সকল যুগেই বেশি।

শুধু বর্তমান আলোচনায় নয়, কবি ও কবিতা বিষয়ে যে কোন আলোচনাতেই আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল হৃদয়ের কারণেই কবি তার সৃষ্টিকে প্রোজ্জ্বল করে তুলতে পারেন। কবির জীবন যখন প্রতিকূল পরিবেশে কঠিনতর অবস্থায় পতিত হয় তখন কবির সংবেদনশীলতার ফল্গুধারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। প্রকৃত কবি অবশ্যই এই বাধাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে সমর্থ হন। কিন্তু এই বাধাপ্রাপ্তি ও অন্যান্য প্রতিকূল ঘটনা তার প্রবহমানতাকে বাঁক বদল করতে বাধ্য করে। পূর্বে আমরা যেমন বলেছি, এরকম প্রতিকূলতার সঙ্গে সহাবস্থান ও ভেতরে ভেতরে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষই জীবনানন্দের কাব্যবোধকে অন্যতর করেছে। এরূপ ক্ষেত্রে আমরা উদঘাটন করতে পারি যে, জীবনের হাজারো প্রতিকূলতায় জীবনানন্দ তার প্রেমকে বাস্তব থেকে সরিয়ে এনে রূপান্তরিত করেছেন কল্পনার নারীর প্রতি। এই কল্পনার নারীটি তার একাকিত্বে ভরা হৃদয়ের দোসর ছাড়া অন্য কিছু নয়। এই নারীকে রূপায়ণের মাধ্যমে তিনি তার কামনা বাসনাকে অন্যতর ব্যঞ্জনায় উপলদ্ধি করতে পারেন, ক্রমে এই নারী তার হৃদয়কে সমাচ্ছন্ন করে এবং কবি যখন দেখেন যে বাস্তবে এই নারী কিংবা এরকম কোন নারী তাকে ভালোবাসেনি, তখন তার হৃদয় এক অভাবনীয় শূন্যতার বোধ আঁকড়ে ধরে, এবং তার নিজেরই প্রতিরূপ জন্ম নেয় এই শূন্যতার গর্ভে।  তখন তিনি নিজেরই প্রেমে মশগুল হন। এই আত্মপ্রেমের ঘটনা কবি ছাড়াও অন্যান্য বক্তির মধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করি কিন্তু অন্যরা যখন বস্তুগত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ঘেরাটোপে আত্মপ্রেমের সৃষ্টিশীলতার ধর্মকে বলী দেন কবি জীবনানন্দ তখন নিজেকে এবং নিজের প্রেমাষ্পদকে ক্রমাগত বিনির্মাণ করে চলেন। জীবনানন্দ তার অজস্র কবিতায় তৈরি করেন এরূপ পরিবেশ পরিস্থিতি, যেখানে তার প্রেমাষ্পদ বাক্সময় হয়ে ওঠে। এভাবেই নিজের তৈরি প্রেমাষ্পদের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে তিনি অভ্যস্থ হয়ে ওঠেন নির্জনতায়। বিষাদের আবহ সৃষ্টি করার মাধমে তার ভেতরটা আনন্দিত হয়। ঝরাপাতার বুকে শুয়ে থাকার আকাক্সক্ষা তিনি হৃদয়ের গভীরে লিপিবদ্ধ করেন, বাসা বাঁধার জন্য পাখিদের ঠোঁটে করে খড় নিয়ে যাওযার দৃশ্য তার নিকট ধরা দেয় ভিন্নতর ব্যঞ্জনায়, তিনি যেন একটি পাখির মতো করেই একটি নীড়ের জন্য নিজস্ব যাবতীয় সঞ্চয় ও কৌশলকে স্পর্শ করতে পারলেই অধিক খুশি হন।

এভাবে নিজেকে শূন্য করে সেই শূন্যতায় কল্পনার নারী কিংবা নিজেরই নিঃসঙ্গতার প্রতিরূপকে স্থাপন করার অভ্যাস ক্রমশ নানাদিকে ছড়িয়ে পড়তে দেখি জীবনানন্দের সমগ্র কাব্যকলায়। এটি তার জন্য  এক অর্থে যেমন সম্ভাবনা ও নতুন বোধের দরজা খুলে দেয় তেমনি আবার বিস্তৃতির পরিভাষার অঙ্গনে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেও ফেলে। এই বেঁধে ফেলার ঘটনার কারণেই খানিকপূর্বে বলা হয়েছে জীবনানন্দের অধিকাংশ কবিতাই প্রেমের কবিতা বা প্রেমের ছায়ায় প্রস্ফুটিত কবিতা। গভীরভাবে জীবনানন্দ পাঠ করলে বোঝা যায় যে একবারেই বিপরীত প্রক্রিয়াতে বা দুইমুখী দুটো ধারাতে একটি বিষয়েই কথা বলে চলেছেন তিনি, আর তা হলো প্রেম। যে প্রেম তার ক্ষেত্রে আত্মপ্রেমে রূপ নিয়েছে তা ক্রমান্বয়ে মানবপ্রেমের কথা বলে, মানুষের অস্তিত্বের ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিতব্যকে উদঘাটন ও সণাক্ত করে। তিনি যখন বিপ্লবের কথা বলেন তখনও তার মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকে আত্মপ্রেম। এই আত্মপ্রেমের শক্তিতেই তিনি নানা দেশের নানা কালের নানা সভ্যতায় নিজেকে অবলোকন করেন, মানুষের অস্তিত্ব ও অগ্রসরমানতাকে রূপায়িত করেন। এই প্রেমেরই বিস্তৃতরূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি তার কবিতায় জ্যোৎস্নার ভেতর সাদা হাসের দল বেঁধে উড়ে যাওয়ার ভেতর, কখনোবা শিকারীর ক্যাম্পে, কখনোবা গুলিবিদ্ধ হরিণীর যন্ত্রণায়, কিংবা দেশবিভাগের দাঙ্গার সময়কার ইয়াসিন, মকবুল,শশীদের বুকের রক্তাক্ততায়।

জীবনানন্দ কখনই নিজের কাছ থেকে নিষ্কৃতি পাননি। এক সার্বক্ষণিক নিমগ্নতা, বিপণœতা, দূরবর্তিকে প্রত্যক্ষ করার ব্যাকুল অভিঘাত, এই সব থেকে মুক্ত হওয়ার ইচ্ছায় কোন অদৃশ্য প্রচন্ডতম শক্তি-সত্ত্বার কাছে তিনি সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন হয়ত, কিন্তু সেই সাহায্য তার জীবনে এসে পৌঁছায়নি। এসে পৌঁছায়নি এই বাক্যের অর্থকে আমরা এভাবে নিতে পারি যে, তিনি চেয়েছিলেন এই সাহায্য আসবে তার একার ক্ষেত্রে নয়, সমস্ত রূপসি বাংলার কবিদের ক্ষেত্রে, শিল্পীদের ক্ষেত্রে, চেতনার কর্মীদের ক্ষেত্রে,- নতুবা তিনি মনে করবেন সেই সাহায্য যথার্থই পৌঁছেনি তার কাছে বা আর কারো কাছে। এই সমতার জন্য তিনি বহুকাল অপেক্ষা করেছিলেন, তিনি তার সৃষ্টিকে সেভাবেই প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু স্বদেশের ঘটনাবলী তার পক্ষে যায়নি। এই না যাওয়ার কারণ হতে পারে বহু বছরের পরাধীনতা, সমাজের মানুষের সামগ্রিক অনগ্রসরতা, এবং আরো অনেক কিছু। জীবনানন্দের নরম হৃদয়কে এই বিপরীত সামাজিক পরিবেশ বিপন্ন করে তুলেছিল, সম্ভবত সে কারণেই তিনি একাত্ম হয়েছিলেন অন্য ভাষার কবিদের কবিতার সঙ্গে। তিনি একইসঙ্গে লক্ষ করেছিলেন যে পাশ্চাত্যে অন্তত চিন্তার মুক্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা নেই। কবিতায় নারীকে একটুখানি খোলামেলা করে উপস্থাপনের জন্য এদেশের মতো করে সেখানে বিড়ম্বিত হতে হয় না, নিন্দিত হতে হয় না।

তিনি তার চতুর্পার্শ্বস্থ কবিদের তুলনায় বইয়ে পড়া কিংবা চিঠিপত্র বা আর কোনভাবে যোগাযোগ তৈরি করা ভিন্ন ভাষার কবিদের বেশি নম্বর দিয়েছিলেন, এবং একান্তভাবেই ঝুঁকে পড়েছিলেন তাদের প্রতি। স্বদেশের বৈরী পরিবেশ তার নিজস্ব সৃষ্টিশীলতার অঙ্গনে যে সমস্ত প্রাচির তৈরি করেছিল, তিনি হয়তো চেয়েছিলেন ভিন দেশীয় ঐসব কবিদের সৃষ্টিকর্মের মিলিত আঘাতে সেসব প্রাচির তিনি গুড়িয়ে দিতে পারবেন। এবং এজন্য বেদনা নিয়েই আমরা দেখি যে, তার অন্তঃকরণ অনেকটাই একাকার হয়ে গিয়েছে, তার কবিতার মধ্যে ঢুকে পড়েছে ভিন দেশের কবিদের ভাবনা, এমনকি সেসব কবির কবিতার হুবুহু অনেক পঙক্তির অনুবাদ কিংবা ভাবানুবাদ। আবার একই সঙ্গে আনন্দিত হই যে এভাবেই জীবনানন্দ নিজেকে ভেঙ্গেচুড়ে নতুন করে গড়েছেন, উজ্জ্বল উদ্ভাসে তার সৃষ্টিশীল অন্তঃকরণ অসামান্য সব কবিতার জন্ম দিয়েছে- সেখানে তিনি এবং তার অন্তঃকরণই মূখ্য, তার একাকিত্বের বেদনা ও সৌন্দর্যবোধের অসামান্যতার সবুজ নান্দনিকতা আর সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে, অতিক্রম করেছে স্থান ও কালিক আয়োজনকে।

কিন্তু শূন্যকে এভাবে পূর্ণ করে তিনি কি সন্তুষ্ট হতে পেরেছিলেন? সম্ভবত পারেননি। পারেননি বলেই তিনি ঘুরে ফিরে এসেছেন নিজেরই সৃষ্টির কাছে। পূর্বে যা বর্ণনা করেছেন, যেসব চিত্র অংকণ করেছেন, বা সচক্ষে দেখেছেন যেসব কিছু, সেসবের কাছেই তিনি বারংবার এসেছেন। এভাবেই তৈরি হয়েছে তার কবিতায় ধীর কিংবা আপাত শ্লথ গতিরেখা, আর গড়ে উঠেছে পঙক্তির পর পঙক্তি দিয়ে তৈরি এমন এক ইমারত যাতে পল্লবিত হয়েছে নানা স্তর, নানা অলিন্দ, হাজার দরজা। ভিন দেশের বোধকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি দেখিয়েছেন একবারেই নিজ দেশের সব দৃশ্যপট। তার কাছে তার স্বদেশের কলকাতা নগরীই প্রকৃত তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত হবে, এই নগরী নিয়ন আলোর আবার বিকেলের নরম রোদের রঙেরও, এই নগরীতে মোটরকার যেমন শঙ্কা নিয়ে ছুটে আসে তার সম্মুখে, তেমনি আবার পাখিরাও নেমে আসে বিকেলের নরম আলোতে, দেবদারু পাতার ফাঁক দিয়ে তিনি দেখতে পান সোনার ডিমের মতো সূর্য আর রূপার ডিমের মতো চাঁদ, দেখতে পান শিশির ঝরছে- তখন তিনি একটি মাত্র শব্দে প্রশ্ন করেন- কলকাতা? উত্তরও দেন সেই একটিমাত্র শব্দে- কলকাতা। স্বদেশের প্রিয় শহরের নাম উচ্চারণের  মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার একটি কবিতা।

জীবনানন্দের কবিতায় একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ের সম্মিলন আমরা লক্ষ করি।

প্রেম, অপ্রেম, প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিশ্বজগতকে তিনি কবিতায় এনেছেন- আলাদা আলাদা কবিতায় নয়, এসমস্ত কিছুকে তিনি এনেছেন একই কবিতার পরিসরে। এসব কবিতার শিরোনাম শেষাবধি কোন বিষয় হয়ে থাকেনি- মহত্তর ভাবনার অভিক্ষেপই প্রধান হয়েছে। কবিতাকে এভাবে বিনির্মাণের কৌশল পৃথিবীর খুব কম সংখ্যক কবির মধ্যে দেখা যায়। জীবনানন্দের লোকেন বোসের জার্নাল কবিতায় দেখা যায় কবি বলছেন, সুজাতা নামের একটি মেয়েকে তিনি ভালোবাসতেন, সেই স্মৃতির কথা। কিন্তু তিনি সেই ভালোবাসাকে পরিনত বয়সের মাপকাঠিতে আপেক্ষিক করে দিচ্ছেন, তার বুক সেলফে থাকা চার্বাক, ফ্রয়েড, প্লেটো, পাভলভ প্রমূখের ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন ভালোবাসার দর্শনের তুল্যমূল্যে। এখন তার আকাক্সক্ষা হয়তো ‘দূর ব্রহ্মান্ডকে তিলে টেনে এনে সমাহিত হওয়া’- তবু তিনি দেখতে পাচ্ছেন, তার কবিতার ভাষায়- ‘ঘাসের ভিতরে নীল সাদা ফুল ফোটে হেমন্তরাগে।

এরকম অজস্র কবিতাতেই জীবনানন্দ তার গভীরতর কবি হৃদয়ের পরিস্ফুটনের কারিশমা দেখিয়েছেন- এজন্যই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে বোঝার জন্য পাঠকের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, একই সঙ্গে এও বলা যায় নতুন যুগে এসে পাঠক যখন বহুমূখী অভিঘাতে মানসিকভাবে নানামূখী সৃষ্টিশীলতার জন্য উন্মুখ হয়েছে তখনই তাদের সম্মুখে আবিষ্কৃত হয়েছে জীবনানন্দের রতœভান্ডার। ত্রিশের কিংবা তৎপূর্বেকার আর কোন কবির মধ্যে এরূপ সম্মিলনের সার্থক মোহনা পাওয়া যায় না।


About The Author

admin

সংবাদের ব্যাপারে আমরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাস করি।বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনায়। আমাদের প্রত্যাশা একাত্তরের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশের পর্যায়ে।

Number of Entries : 7530

Leave a Comment

সম্পাদক : সুজন হালদার, প্রকাশক শিহাব বাহাদুর কতৃক ৭৪ কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। ফোনঃ 02-9669617 e-mail: info@visionnews24.com
Design & Developed by Dhaka CenterNIC IT Limited
Scroll to top