The news is by your side.

জাপানের আটটি কম্পানি বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ নিয়ে আসছে

0 42

 

 

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে (এফডিআই) প্রায় ৬০ শতাংশ। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আশাবাদ জাগাচ্ছে জাপান। জাপানের বেশ কিছু কম্পানি এরই মধ্যে বাংলাদেশের অটোমোবাইল, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্য-প্রযুক্তি, সার কারখানা, অবকাঠামো, টোব্যাকোসহ কয়েকটি খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে। জাপানের আরো অন্তত আটটি কম্পানি বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ নিয়ে আসছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আড়াইহাজারে জাপানের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্লট বরাদ্দ দেওয়া শুরু হলে এই বিনিয়োগ আরো কয়েক গুণ বাড়বে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে চলমান সংস্কার কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে।

জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) তথ্যানুযায়ী, ২০০৮ সালে বাংলাদেশে কর্মরত জাপানি কম্পানির সংখ্যা ছিল ৭০। ১২ বছর পর ২০২০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৫। জাপানের সজিত করপোরেশন মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প পার্ক করতে চাইছে। জাপানের সুমিতমো করপোরেশন জাপান অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নকাজ করতে চুক্তি করেছে বেজার সঙ্গে। ঢাকায় একের পর এক স্টোর খুলছে জাপানি পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড মিনিসো। জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিনিয়োগ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানি কম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগ বেড়েছে ৪০ শতাংশ।

বৈশ্বিক পরামর্শক সংস্থা প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারসের (পিডাব্লিউসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ কম্পানি বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানো, মজুরি ও অন্যান্য ব্যয় কমাতে চীন ছাড়তে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশের বহুজাতিক কম্পানি তাদের উৎপাদনব্যবস্থা চীন থেকে অন্য দেশে নিয়ে যাচ্ছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের জেরে চীন থেকে ৮৭ জাপানি কম্পানি বিনিয়োগ তুলে থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, মালয়েশিয়ায় নিয়ে গেছে।

ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশে অটোমোবাইল কারখানা স্থাপনের চিন্তা করছে জাপান। আড়াইহাজার ইকোনমিক জোন জাপানি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে বলে তিনি মনে করেন।

গত কয়েক বছরে হোন্ডা মোটর করপোরেশন, জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল, নিপ্পন স্টিল অ্যান্ড সুমিতমো মেটাল, মিতসুবিশি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। জাপানের মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড হোন্ডা বাংলাদেশে কারখানা করেছে। এ ছাড়া জাপানের ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের কারখানা করেছে এসিআই কম্পানিটির সহায়তা নিয়ে। বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিপ্পন স্টিল অ্যান্ড সুমিতমো মেটাল দেশীয় প্রতিষ্ঠান ম্যাকডোনাল্ড স্টিল বিল্ডিং প্রডাক্টসের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইস্পাত কারখানা করছে। তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান জেটিআই গ্রুপ একক জাপানি কম্পানি হিসেবে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেছে। প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ২০১৮ সালে আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কিনে নিয়েছে গ্রুপটি।

জেটিআই বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর জাকির ইবনে হাই কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে একক বৃহত্তম বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারী হিসেবে আমরা আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও অবকাঠামো তৈরি করার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা এরই মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১২ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছি, তিনটি কারখানা পরিচালনা করছি। জেটিআই ভবিষ্যতে দীর্ঘ মেয়াদে আরো বৃহৎ পরিসরে বিনিয়োগ করতে এবং দেশের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সিএসআর (করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) পার্টনারশিপে অংশ নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

এদিকে বাংলাদেশের আইচি মেডিক্যাল গ্রুপের অংশীদারিতে জাপানি সংস্থা শিপ হেলথকেয়ার হোল্ডিংস দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট ডেডিকেটেড ক্যান্সার হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করবে ঢাকায়। হাসপাতালের জন্য ঢাকার পূর্বাচলে ২০০ কোটি টাকা মূল্যের ছয় বিঘা জমি দেবে আইচি, বাকি বিনিয়োগ আসবে শিপ হেলথকেয়ার থেকে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা এই প্রকল্পের একটি অংশ।

আইচি মেডিক্যাল গ্রুপের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নকশার অনুমোদন পেয়েছি। বাংলাদেশে এটি হতে যাচ্ছে যৌথ উদ্যোগে দ্বিতীয় হাসপাতাল। ২০২৪ সালের শুরুতে এই হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করতে পারব বলে আশা করছি। এই হাসপাতালে অন্তত দুই হাজার ৫০০ জনের কর্মসংস্থান হবে।’

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) জেনারেল সেক্রেটারি তারেক রাফি ভূঁইয়া বলেন, ‘শুধু চীন ছেড়ে যাওয়া কম্পানি নয়, জাপান থেকে সরাসরি অনেক কম্পানি এখন বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছে। মিত্সুবিশি ও সুজুকি মোটরস বাংলাদেশে আরো বড়ভাবে গাড়ি উৎপাদন শিল্পে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। জাপানের সর্ববৃহৎ জ্বালানি কম্পানি জেরা বিনিয়োগ করেছে সামিট পাওয়ারে। তারা সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের ২২ শতাংশ শেয়ার ৩৩ কোটি ডলারে কিনে নিয়েছে। শিপ হেলথকেয়ার হোল্ডিংস ক্যান্সার হাসপাতাল করতে সম্প্রতি দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এই ধরনের বড় বড় বিনিয়োগ আরো বাড়বে।’

তিনি বলেন, আগামী বছরটি জাপানি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মাইলফলক হতে পারে। তবে বাংলাদেশে যে ৩১৫টি জাপানি কম্পানি কাজ করছে তাদের ট্যাক্স-ভ্যাট, ওয়ানস্টপ সার্ভিস বন্দরসহ অন্যান্য বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার এগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে। এসব সেবা আরো উন্নত করতে হবে, বিনিয়োগবান্ধব হতে হবে।

জেট্রো বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ও জেবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট ইউজি আন্দো কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে জাপানি কম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। সম্প্রতি একটি ভার্চুয়াল ডায়ালগে চার শতাধিক জাপানি কম্পানির অংশ নেওয়া সেই আগ্রহের প্রতিফলন। অটোমেটিভ সেক্টর, এফএমসিজি, হেলথকেয়ার, ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে বেশ কিছু কম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।’

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা করোনার মধ্যেও জাপানের সঙ্গে ভার্চুয়াল মতবিনিময় চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সর্বশেষ বৈঠকে ৪৪টি জাপানি কম্পানির দুই শতাধিক প্রতিনিধি যুক্ত হয়েছিলেন। মারুবেনি, হোন্ডা, সামিটুমো করপোরেশনের মতো কম্পানি আরো বিনিয়োগের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। আইএফসি জাপান থেকে আমাদের জানানো হয়েছে, আটটি কম্পানি বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তারা আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপন করবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ইনসেনটিভ প্যাকেজ চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছি। আগামী মাসে আমাদের সরকারি পর্যায়ে পাবলিক-প্রাইভেট ইকোনমিক ভার্চুয়াল ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হবে। আমরা আশা করছি, সেখানেও বড় কিছু জাপানি কম্পানির বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাব।’

এদিকে আগামী ১০ বছরে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেআইটিও), জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই) ও চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)। আগামী রবিবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির উপস্থিতিতে এ বিষয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি হবে।

 

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.