খেলাপি ঋণ : সংকটে দেশের ব্যাংকিং খাত Reviewed by Momizat on . বিশেষ প্রতিবেদক উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে ঋণ প্রবাহও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেগবান করছে। গত পাঁচ বছরে ঋণের স্থিতি বেড়েছ বিশেষ প্রতিবেদক উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে ঋণ প্রবাহও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেগবান করছে। গত পাঁচ বছরে ঋণের স্থিতি বেড়েছ Rating: 0
You Are Here: Home » slider » খেলাপি ঋণ : সংকটে দেশের ব্যাংকিং খাত

খেলাপি ঋণ : সংকটে দেশের ব্যাংকিং খাত

12

বিশেষ প্রতিবেদক

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে ঋণ প্রবাহও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেগবান করছে। গত পাঁচ বছরে ঋণের স্থিতি বেড়েছে প্রায় ৫০.৪%;  আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণও একই গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪৮%। ব্যাংকিং খাতে যেভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে ব্যাংকিং খাত বর্তমানে হুমকির মুখে।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার ১০.৬৭%,  যা প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি। ভারতের ঋণখেলাপি ৭.৬% এবং শ্রীলঙ্কার ৩%। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ এবং অবলোপনকৃত ঋণ মিলে প্রায় ১,২৫,৩০৭ কোটি টাকা যা মোট ঋণের (মোট ঋণ ৭ লক্ষ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা) প্রায় ১৬.৬৪%। এক প্রান্তিকেই খেলাপি ঋণের  পরিমান বেড়েছে ৬,১৫৯ কোটি টাকা। এর বাইরেও অনেক ঋণগ্রহীতা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের মাধ্যমে তাঁদের ঋণকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবিতে খেলাপি ঋণ হিসাবে দেখাচ্ছেন না।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া উচিৎ নয়

মোঃ খোরশেদ আলম

হেড অব স্পেশাল অ্যাসেট ডিভিশন, ইস্টার্ণ ব্যাংক লিমিটেড

ক্রমবর্ধমান ঋণখেলাপি ব্যাংকিং খাতকে সুদূরপ্রসারী ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এতে যেমন ব্যাংকের ঋণ প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে,  একই সঙ্গে তারল্য সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে স্থিতি রাখতে গিয়ে দুর্বল মূলধন সম্পন্ন ব্যাংকগুলি আরও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং নেট মুনাফা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। মন্দ ঋণের অনাদায়ী সুদের পরোক্ষ ভার বহন করতে হচ্ছে ভাল গ্রহীতাকে। সরকারি, বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২৬% ।

সুপারিশ

ব্যাংকের ১০% এর মত পরিচালকদের মূলধন থাকলেও ৯০% গ্রাহকদের আমানত থেকেই ঋণ প্রবাহ করে থাকে। তাই আমানতকারিদের স্বার্থ রক্ষার্থে কর্পোরেট সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে ব্যাংকগুলোকে পরিচালকদের পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। একই পরিবার থেকে একাধিক পরিচালক নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিচালক হিসাবে ব্যাংকগুলোর পরিচালনায় স্বেচ্ছাচারিতারোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণের বলিষ্ঠ ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।

১।    রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান না করা। দুর্বল মৌল ভিত্তির / সমস্যায় জর্জরিত ব্যাংক গুলোকে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর সাথে একীভূত করা।

২।    কোন রকম চাপ ব্যতিরেখে ঋণগ্রহীতার সঠিকতা যাচাই বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান করতে হবে।

৩।   ঋণ খেলাপিদের সামাজিক ভাবে বয়কট করা।

৪।    প্রতিটি ব্যাংকে খেলাপি বা অনাদায়ী ঋণ আদায়ে যোগ্য লোকের সমন্বয়ে একটি রিকভারি বিভাগ থাকতে হবে। এই বিভাগে শক্তিশালী লিগ্যাল টিমের সমন্বয়ে আইনগতভাবে  ঋণখেলাপিদের মোকাবেলা করা এবং ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করা।

৫।   বর্তমানে ঢাকায় ৪টি এবং চট্টগ্রামে একটি মাত্র অর্থঋণ  আদালত রয়েছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ মামলা বিচারাধীন। বিপুল পরিমান মামলা থাকায় বিচার ব্যবস্থা বিলম্বিত হচ্ছে  এবং খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় দিন দিন আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের নিমিত্তে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং সেই সাথে দ্রুত রায় বাস্তবায়নে সরকারকে নীতি নির্ধারণেও অর্থঋণ আদালত আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করতে হবে।

৬।   ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত ক্রিমিনাল মামলাগুলোর জন্য অর্থঋণ আদালতের মত আলাদা আদালত গঠন করতে হবে, যাতে মামলার জট কমিয়ে মামলা দ্রুত নিস্পত্তি করার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হয়।

৭।    ঋণ প্রদানের সময় ঋণের পরিমাণ প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা অবশ্যই যাচাই করতে হবে।  ঋণ বিতরণের পর তা নির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত হচ্ছে কি না তা তদারকি করতে হবে।

৮।   ঋণের কিস্তি নগদ প্রবাহের সাথে অবশ্যই সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

৯।   বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম নীতি আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

১০।   সরকারী ব্যাংকগুলোকে আর্থিক বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রনে আনতে হবে এবং অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দূর করতে হবে।

১১।   কোন ঋণগ্রহীতাকে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ চাইতে হলে তাকে কমপক্ষে ১০-১৫% জমা প্রদানের বিধান থাকা উচিত যাতে, যে কেউই ইচ্ছা মত সিআইবিতে ঋণ খেলাপি হিসাবে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ না নিতে পারে।

খেলাপি ঋণের জন্য চেয়ারম্যানরাই দায়ী

কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ

চেয়ারম্যান, স্টান্ডার্ট ব্যাংক লিমিটেড

সবাই একবারে বড়লোক হয়ে যাবো, এমন ধারণা থেকেই ব্যাংকিং খাতে লুটপাট বাড়ছে। আমি আজ এই পর্যায়ে এসেছি ৫৫ বছর কাজ করে। কেউ বলতে পারবে না ৫ টাকা কারো কাছ থেকে নিয়েছি বা হাজার টাকা কামাই করছি।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত, যে ব্যাংকার মানুষকে অতি সহজে টাকা দিয়ে দেয় সে ব্যবসার শত্রু। আমার ব্যাংকার যদি কাউকে ডেকে নিয়ে বলে যে ভাই আসেন আমারে কিছু দেন, আপনিও কিছু নিয়ে যান, সেকি বন্ধু হবে? আর যদি বলে আইন কানুনের বাইরে আমি কোন টাকা দিতে পারবো না, সেই প্রকৃত বন্ধু।

বাংলাদেশে ঋণ খেলাপির যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, একদিন এটা শেষ হবেই। টাকা যারা নিয়েছে শুধু তাদের দোষ দিলে হবে না, টাকা যারা দিয়েছে তাদেরও দোষ আছে। ম্যানেজারেরও দোষ আছে। আমাদের ম্যানেজিং ডাইরেক্টরদের দোষ থাকতে পারে কিন্তু কথা হল, এই লেভেলে যদি সরাসরি চেয়ারম্যান হস্তক্ষেপ করে তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। যে চেয়ারম্যান সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটে না।

Dr. Ahsan H. Mansurব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে

ড. আহসান মনসুর

নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট

ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে-উল্টো ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ ব্যাংকিং খাতের অপচয় দুর্নীতি আরো বেশি উৎসাহিত করবে। আশংকার কথা, সরকারকে নিয়মিতই এ ভর্তুকি দিতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে সমস্যা অনেক। অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতির পাশাপাশি ব্যাংকিং মামলা নিষ্পত্তিতে রয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা। এর ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন, যা দুর্নীতিকে আরো বেশি উৎসাহিত করছে।

মাত্র কয়েকটি পরিবারের কাছে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাত  জিম্মি থাকবে-এটাতো হতে পারে না। বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা পারস্পরিক যোগসাজসে নামে বেনামে আমানতকারীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে- শিগগিরই ব্যাংকিং খাতে ধস নামবে, যা দেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড পুরোপুরি ভেঙ্গে দিবে।

ব্যাংকিং খাতে তৃতীয় শ্রেণীর লুটপাট হচ্ছে

এম এ মান্নান

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী

ঋণখেলাপী তারাই করে যারা ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। এটা থেকে আমরা এখনও নিজেদের মুক্ত করতে পারিনি। অবশ্যই আমরা খেলাপী ঋণ চাইনা। এটা কোন সরকার চায় না, আমরাও চাই না। কিন্তু একটা অসুবিধা এখানে আছে, যেমন সামরিক সরকার, বৈপ্লবিক করকার, একদলীয় সরকার; তারা যে গতিতে কাজ করতে পারে; যেমন চীন সরকার-চীনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশাল সংগ্রাম চলছে, বড় বড় লোককে তারা গুলি করে মেরেছে, জেলে পুরছে। কিন্তু আমাদের মত গণতান্ত্রিক সরকারকে কিন্তু আপোষ করে চলতে হয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়। আমরা ভোটের উপর নির্ভরশীল। আমরা যদি ভোট হারাই তাহলে আমরা তো পদই হারাবো। পদ হারালেতো কোন কাজ করতে পারবো না। সূতরাং পদে থাকার জন্য আপোষ করে চলতে হয়।

এ জন্য আমাদের গতিটা স্লথ, কম, আমি স্বীকার করছি কিন্তু এর বিকল্প আমাদের হাতে নেই। তারপরেও একটা ব্যাংক আপনি পাবেন না যেখানে আমরা মামলা করিনি বা প্রক্রিয়ার মধ্যে নেই। দুদক আছে, সরাসরি মামলা করা হয়, বিভাগীয় কিছু মামলা করা হয়। সবকিছুই লিপিবদ্ধ আইনের আওতায় করা হয়।

আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করার মত ক্ষমতা কারোরই নেই। সরকারের তো অবশ্যই নেই। আমি আশাবাদী কারণ, আমাদের নতুন প্রজন্ম যেভাবে উজ্জীবিত এবং তাদের নৈতিক অবস্থানও যেরকম সেটা অনেক অনেক ভালো, উন্নত, প্রগতিশীল-আমাদের সময়ের তুলনায়। আমি মনে করি, তৃতীয় শ্রেণীর লুটপাট যেটা হচ্ছে ভয়ঙ্কর রকমের লুটপাট; এগুলো কমে আসবে।

Abul Maal

ঋণ খেলাপির জন্য কিছু ব্যাংক দায়ী

আবুল মাল আবদুল মুহিত

অর্থমন্ত্রী

ঋণ খেলাপি তৈরিতে কিছু ব্যাংকই দায়ী। কিছু ব্যাংকের তার গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার দিন থেকে ঋণ খেলাপিতে পরিণত করার প্রবণতা আছে। তারা মনে করে- গ্রাহককে ঋন খেলাপি করা গেলে, তাদের উপর (প্রতিষ্ঠান) ব্যাংকের আধিপত্য বাড়বে বা ওই গ্রাহকরা ব্যাংকগুলোর অধীনে থাকবে।

About The Author

admin

সংবাদের ব্যাপারে আমরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাস করি।বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনায়। আমাদের প্রত্যাশা একাত্তরের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশের পর্যায়ে।

Number of Entries : 7512

Leave a Comment

সম্পাদক : সুজন হালদার, প্রকাশক শিহাব বাহাদুর কতৃক ৭৪ কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। ফোনঃ 02-9669617 e-mail: info@visionnews24.com
Design & Developed by Dhaka CenterNIC IT Limited
Scroll to top