The news is by your side.

করোনা-মুক্তি: জাপানের সাফল্য অনেকের কাছেই বিস্ময়

0 67

 

 

এপ্রিল মাসের ৭ তারিখে জাপানে প্রথম সীমিত আকারে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর থেকে দেশের নাগরিক জীবন ছিল ঘরবন্দী, যদিও জরুরি অবস্থায় লকডাউনের মতো বাইরে বের হওয়ার ওপর সার্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়নি। এর দিন দশেক পর সারা দেশকে জরুরি অবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হলে সীমিত মাত্রায় হলেও কিছুটা আতঙ্ক জনগণের মনে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল। অনেকেই তখন জাপানকে এই বলে দুষছিলেন যে ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা জাপান খুবই সীমিত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখায় অচিরেই নতুন সংক্রমণের বিস্ফোরণ দেশে লক্ষ করা যাবে, যার পরিণতিতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ধস নামবে। তবে সে রকম সমালোচনা সত্ত্বেও জাপান সরকারের উপদেষ্টা প্যানেল এ কারণে অবস্থান থেকে সরে আসেনি যে প্যানেল মনে করেছে কোনো রকম উপসর্গহীন সুস্থ লোকজনের জন্য করোনা পরীক্ষা চালানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হলে হাসপাতালের ওপর অযথা চাপ তা বাড়িয়ে দেবে এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় ইতিমধ্যে হিমশিম খেতে হওয়া চিকিৎসাকর্মীদেরও তা বিপাকে ফেলবে। শুধু তা–ই নয়, এমনকি হালকা উপসর্গ দেখা দেওয়া করোনায় সংক্রমিত লোকজনকে হাসপাতালে ভর্তি না করে বরং নিজেদের বাড়িতে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ  দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য সরকার এ রকম হালকা উপসর্গের রোগীদের বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য হোটেল ভাড়া নিয়েছিল, যদিও সেই সব হোটেলে রোগীর তেমন ভিড় দেখা যায়নি।

এসব ব্যবস্থার কারণে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সংখ্যা সর্বোচ্চে পৌঁছে যাওয়ার পর ধীরে তা আবারও নামতে শুরু করলে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখতে হয়। জরুরি অবস্থা চলাকালে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব তা রাখতে শুরু করে। সেই দিকটি বিবেচনায় রেখে যতটা সম্ভব কম সময়ের মধ্যে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া সরকার বিবেচনা করে দেখলেও সিদ্ধান্তকে যুক্তিসংগত করে তুলতে শুরুতে বেশ কয়েকটি পূর্বশর্ত সরকারকে নির্ধারণ করে নিতে হয়েছিল, যার মধ্যে প্রথমেই ছিল প্রতি এক লাখ জনসংখ্যায় নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার আনুপাতিক হিসাব ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসা।

জাপানে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে শুরুর দিনগুলোতে অনেকটা হইচই শোনা গেলেও চিহ্নিত সংক্রমণের সংখ্যা কিংবা মৃত্যুর হিসাব, কোনো দিক থেকেই জাপানের অবস্থা পশ্চিমের অনেক দেশের মতো আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়নি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত সোমবার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মানুষ জাপানে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন মারা গেছে। দুই হিসাবই বলে দেবে জাপানের পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক আকার নেয়নি। যদিও এপ্রিল মাসের শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল, চীন কিংবা ইউরোপের মতো একই রকম বিপর্যয় জাপানেও দেখা দিতে পারে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ভাইরাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ায় শুরুতে জাপানের নেওয়া পদক্ষেপ ছিল অনেকটাই যেন বিভ্রান্তিকর। জানুয়ারি মাসে উহান দুর্যোগের সূত্র ধরে জাপানে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে প্রমোদতরি ডায়মন্ড প্রিন্সেসের গুচ্ছ সংক্রমণ হঠাৎ করে দেশের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কী করণীয়, তা নিয়ে জাপানের চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বলা যায়, বিভ্রান্তির সূচনা সেখান থেকে। তবে দেশের ভেতরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে জাপান সেই বিভ্রান্তির অবস্থা দ্রুত কাটিয়ে ওঠে এবং সংকট মোকাবিলার নিজস্ব পথ ধরে অগ্রসর হতে শুরু করে।

সেই পথে জাপানের সাফল্য এখন অনেকের কাছেই বিস্ময় হিসেবে ঠেকছে। তবে সাফল্যের পেছনে সরকারের দেওয়া দিকনির্দেশনা ছাড়া জাপানের প্রচলিত স্বাস্থ্যবিধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মাস্কের ব্যবহার যেমন জাপানে নতুন কিছু নয়। একইভাবে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং বাইরে থেকে ফিরে এসে পোশাক বদলানোসহ স্নানের অভ্যাসও দূষণ ঘরের বাইরে রাখতে জাপানিদের সাহায্য করেছে। ফলে জরুরি অবস্থায় ঘরে আটকা পড়া মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তেমন দেখা যায়নি। বরং অনেকে সংক্রমিত হয়েছেন হাসপাতাল সূত্রে। ফলে হাসপাতালে ভিড় এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে সংক্রমণ সামাল দেওয়া জাপানের জন্য ছিল যুক্তিসংগত।

সংখ্যাগত হিসাবের ওঠানামা সত্ত্বেও করোনাভাইরাস ধীরে প্রশমিত হয়ে আসার চিহ্ন পরিষ্কার হয়ে ওঠার মুখে জাপান কিন্তু এখনো সতর্কতা বজায় রেখে চলেছে। নতুন আরেকটি তরঙ্গ এলে পরিস্থিতির খুব বেশি অবনতি যেন না হয়, সে জন্য ইংরেজি আদ্যাক্ষর সি দিয়ে শুরু হওয়া তিনটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার উপদেশ নাগরিকদের দেওয়া হচ্ছে। বিষয় তিনটি হচ্ছে—বায়ু চলাচল সীমিত থাকা বদ্ধ কোনো স্থানে অবস্থান না করা, সাধারণত সংগীতের লাইভ শো আয়োজনের ছোট আকারের হলো এবং কাউকে বার ও সে রকম কিছু বিনোদনের স্থান যার মধ্যে দিয়ে চিহ্নিত করা হয়; ভিড়ের জায়গা থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা; এবং অন্য মানুষের খুব কাছাকাছি সংযোগে না আসা। দেশের লোকজন এর সব কটি কমবেশি মেনে চললে চূড়ান্ত বিজয় অচিরেই অর্জন করা সম্ভব হবে বলে সরকারের পাশাপাশি চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন। ফলে করোনার ভীতিও এখন ধীরে কেটে যেতে শুরু করেছে। তবে দেশের অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে কি না, সেই প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যাচ্ছে।

 

 

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.