কবি হৃদয়ে বর্ষার সংবেগ Reviewed by Momizat on .   ইয়াসির আজিজ কবির কাছে সবচেয়ে রোমান্টিক ঋতু হচ্ছে বর্ষাকাল। অঝোর বর্ষণ এক অর্থে কবির অঝোর ধারায় সৃষ্টিরই সহোদর। বর্ষায় খাল বিল নদী নালা যেমন কানায় কানায় ভ   ইয়াসির আজিজ কবির কাছে সবচেয়ে রোমান্টিক ঋতু হচ্ছে বর্ষাকাল। অঝোর বর্ষণ এক অর্থে কবির অঝোর ধারায় সৃষ্টিরই সহোদর। বর্ষায় খাল বিল নদী নালা যেমন কানায় কানায় ভ Rating: 0
You Are Here: Home » কালস্রোত » কবি হৃদয়ে বর্ষার সংবেগ

কবি হৃদয়ে বর্ষার সংবেগ

কবি হৃদয়ে বর্ষার সংবেগ

 

ইয়াসির আজিজ

কবির কাছে সবচেয়ে রোমান্টিক ঋতু হচ্ছে বর্ষাকাল। অঝোর বর্ষণ এক অর্থে কবির অঝোর ধারায় সৃষ্টিরই সহোদর। বর্ষায় খাল বিল নদী নালা যেমন কানায় কানায় ভরে ওঠে তেমনি কবির হৃদয়ও পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে শব্দ, সুর আর ছন্দে। বৃষ্টির সঙ্গে যেন পাল্লা দিতে চায় কবির সৃষ্টিধর্মীতা। এজন্যই বাংলা সাহিত্যে আমরা পাই বর্ষর অসংখ্য কবিতা ও গান।

বধুয়া নিদ নাহি আঁখি পাতে

আমিও একাকী তুমিও একাকী

আজি এ বাদল রাতে’

এই পঙক্তি কয়টি বর্ষাকে কেন্দ্র করে শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক উচ্চারণ বাংলা কবিতায়।

মূলত কবির হৃদয় এক আয়না। সেই আয়নায় কবি দেখতে পায় তা চারপাশকে। এই চারপাশে নানা ঘটনা ও জীবনাচার যেমন থাকে, তেমনি থাকে প্রকৃতি। কবি মানুষের অনেক সুখ-দুঃখের কার্যকলাপ দেখে প্রভাবিত হয়, কিন্তু সে নিজেকে আর দশজন থেকে সযত্নে আলাদা করেও রাখে। কবি তার নিজের ভাবনাকেই প্রাধান্য দেয়, নিজের সৃষ্টির জন্য সে সতত খুঁজে ফেরে অন্য কিছু। এই অন্য কিছুর জন্য উদগ্রীব কবির হৃদয়কে চিরকালই ভরে রাখে প্রকৃতির দৃশ্যপট। প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রকৃতির রুদ্ররূপ যেন এক অফুরন্ত উৎস কবির রচনার জন্য। কবি, এবং সাধারণ যে কোন ভাবুক মানুষও প্রকৃতির অফুরন্ত সম্ভারকে যখন হৃদয় ও শরীর দিয়ে অনুভব করতে থাকে, তখন তার মধ্যে গুঞ্জরিত হয় নানা ধ্বনি, এই ধ্বনিই তৈরি করতে পারে কবিতার আশ্চর্য সব পঙক্তিমালা।

Rain

বর্ষা এক আশ্চর্য পরিবর্তনের ইঙ্গিতকে আমাদের সম্মুখে প্রকাশ করে। আমরা সব সময় যে আকাশকে দেখি-রৌদ্রকরোজ্জ্বল কিংবা জোৎস্না-ধোয়া, অসংখ্য নক্ষত্রজ্বলা, সে আকাশটিই বর্ষার কালো মেঘে অবলীলায় কী রকম বদলে যায়। সমস্ত আকাশ মেঘে মেঘে ঢেকে যায়, দূর থেকে বাতাস বয়ে আনতে থাকে জলের শীতল স্পর্শ, এরপর নামে বৃষ্টি। বিরামহীন সে বৃষ্টি। আকাশ ফুটো হওয়া সেই বর্ষণ চলতে পারে এক নাগাড়ে কয়েক দিন ধরে।

আমরা আশৈশব দেখে অভ্যস্ত বলেই এমন আশ্চার্য হওয়ার মতো বিষয়টিকে নিয়ে ভাবিত হই না। কিন্তু মনের মধ্যে এই প্রশ্ন কি গুঞ্জরিত হয় না- দূরের আকাশ থেকে এই অবিরল জলের ধারা প্রকৃতির কেমনতর দান? কী অবাক করা বদলে যাওয়া সমস্ত আকাশের ও দিগন্তের দৃশ্যপট- অন্তহীন আকাশকে মেঘের পর্দার আড়ালে রেখে দিয়ে আমাদের এই ভূখণ্ডের সঙ্গে শুধুই জলের ধারার সংযোগ। মাঠে মাঠে বৃষ্টির গান, হাওয়ার উৎপাত, বিদ্যুতের ঝলকানি, জলচর প্রাণিদের উল্লাস আর উৎসব, বৃক্ষের সবুজ সতেজ আস্ফালন। আর সেই আবহমান কাল ধরে দেখা যতসব দৃশ্যপট- গাঁয়ের, মফস্বলের, শহরেরও। আর বর্ষায় নতুন প্রাণ পাওয়া বিল ঝিল, নবযৌবনা নদীর দূরন্ত উচ্ছলতার গল্প।

জলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। মানুষের শরীরের অনেকখানিই জল। এই জলের ঘাটতি হলে মৃত্যু ঘটে যেতে পারে। মানুষ জল গ্রহণ করে, জল ত্যাগ করে, এটা তার জন্মগত প্রয়োজন ও অভ্যাস- জল তাকে বাঁচিয়ে রাখে, জল তার শরীরের ভেতর ও বাহিরকে পরিশুদ্ধ করে। সুতরাং অঝোর ধারার জলের দিন রাত্রিতে সে তার সত্তার অনেক গভীরে ডুব দিয়ে অন্যতর উপলব্ধিতে ঋদ্ধ হতে পারে। প্রকৃতির নানা দৃশ্যের সঙ্গে সে তার মনের ক্যানভাসকে মিলিয়ে নতুন করে আঁকতে পারে। অন্যতর সৃষ্টির একতারা কবির মনে বাজতে থাকে বর্ষায় প্রকৃতির সঙ্গে ঐক্যতানে। বর্ষার কবিতা বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ও প্রাচুর্যভরা সম্পদ।

কবিতায় বর্ষার নিবিড় আলিঙ্গনকে বুঝে উঠতে চাইলে আমাদের বুঝতে হবে গ্রাম বাংলার ভূ-প্রকৃতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে। এবং অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে বিগত কয়েক দশকের দ্রুত নগরায়ণ ও মরুকরণ প্রবণতাকে। আজকের বাংলাদেশে আমরা বর্ষাকে যেমন দেখি ত্রিশ চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর আগে দেখতাম তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি উত্তাল রূপে। সেই সময়কার দৃশ্যপটে বর্ষা মানে শুধুই জলের রাজ্য। নদীর দেশে, বিলের দেশে দেখা যেত জল আর জলের দিগন্ত শুধু। তো সে সময়কার বোধগুলো যেভাবে কবিতায় রূপান্তরিত হয়েছে তাকে আমরা এখন আর এ সময়কার দৃশ্যপটে পুনরুজ্জীবিত করতে পারি না। এখন সেই ধু ধু জলের পাথার কোথায়। জল পাড়ি দিয়ে প্রেমিকার কাছে পৌঁছানোর আকুলতা ও বার্তা পৌঁছানোর অসম্ভতার দুঃখগুলো তো প্রায় নেই-ই। মুহূর্তেই কথা বলা যায় প্রযুক্তির কল্যাণে। দিন রাত্রির ঝরঝর ধারা অকূল পাথারকে জলের খেলায় যেরকম ভুলিয়ে রাখে, প্রেমিক প্রেমিকাকে অভিসারের থেকে সরিয়ে রাখতে সেরকম পারে না। তবু, আজও বর্ষা অনন্য। আজও হৃদয়ের সংবেগে বর্ষার বেগ কম নয়।

আজকের কবি বর্ষায় প্রকৃতির কাছে যখন বাঁধা থাকে তখনও জীবন যাপনের নানা দিক ও প্রযুক্তিকে ভোলে না। ফলে আধুনিক কবিতায় বর্ষার চিত্রকল্প অনেকটা মিশ্রিত ভাবকে প্রকাশ করতে পারে। বর্ষণমুখর দিনে নানা ইচ্ছাকে নিয়ে কবির পঙক্তিমালা এগোতে পারে, সেই ইচ্ছা হয়তো কখনো কখনো এমন যে- প্রেমিকাকে কাছে পেয়েও প্রেমিক আরো কিছু চাচ্ছে-হয়তো সে থাকতে চাচ্ছে অরণ্যের কাছাকাছি কোন নিরিবিলি বাংলোয়, হয়তো সে শহরের জীবনের থেকে পালাতে চেয়ে কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে গ্রামের এক কুঁড়েঘর, জলে ডোবা উঠোন আর পাশেই নদীর উদ্দামতা। হয়তো সে এসব ভাবনা তার প্রেমিকার সঙ্গে সেভাবে ভাগাভাগি করতে পারছে না, সে চাইছে এগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিতে। সে হয়তো ঝমঝম বৃষ্টির সুরকে ছড়িয়ে দিতে চাইছে বিশ্বব্যাপী, শব্দমালার সাহায্যে। এভাবেই বর্ষা প্রণোদনা যুগাচ্ছে একেবারে উত্তরাধুনিক এক কবিতার রচয়িতাকেও। এ সময়ের কবিতার চিত্রকল্পগুলোর কাঠামোকে একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে তবেই হয়তো বুঝে নিতে হচ্ছে। হয়তো কোন কোন পঙক্তি দুর্বোধ্যই ঠেকছে পাঠকের কাছে। তবুও ভালো কবিতায়, উত্তীর্ণ কবিতায় রসের ঘাটতি থাকে না। আর বর্ষায় সিক্ত যে কবিতা, সে কবিতার প্রাণরস অবশ্যই সিক্ত করে পাঠকের হৃদয়কে। বর্ষার সুর ও ছন্দে কবিতা বেজে ওঠে একাধারে চিরকালিন ও নতুনতর ব্যাঞ্জনায়। কবির হৃদয়ে বর্ষার সংবেগ জেগে থাকে, তাতেই লেখা হয়ে যায় প্রাণ ভরানো পঙক্তিমালা।


About The Author

admin

সংবাদের ব্যাপারে আমরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাস করি।বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনায়। আমাদের প্রত্যাশা একাত্তরের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশের পর্যায়ে।

Number of Entries : 7530

Leave a Comment

সম্পাদক : সুজন হালদার, প্রকাশক শিহাব বাহাদুর কতৃক ৭৪ কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। ফোনঃ 02-9669617 e-mail: info@visionnews24.com
Design & Developed by Dhaka CenterNIC IT Limited
Scroll to top