এমনি বরষা ছিল সেদিন Reviewed by Momizat on . সুদেষ্ণা মজুমদার একটা একটা করে ঘরের সবকটা দরজা-জানলা বন্ধ করে দিলো অনন্যা। তার ভালো লাগছে না এত আলো। এত উজ্জ্বল আলো তার মনে ধাঁধা ধরিয়ে দিচ্ছে। ঘুলঘুলি আর এদিক সুদেষ্ণা মজুমদার একটা একটা করে ঘরের সবকটা দরজা-জানলা বন্ধ করে দিলো অনন্যা। তার ভালো লাগছে না এত আলো। এত উজ্জ্বল আলো তার মনে ধাঁধা ধরিয়ে দিচ্ছে। ঘুলঘুলি আর এদিক Rating: 0
You Are Here: Home » শিল্প-সংস্কৃতি » এমনি বরষা ছিল সেদিন

এমনি বরষা ছিল সেদিন

chupbaranda1
সুদেষ্ণা মজুমদার

একটা একটা করে ঘরের সবকটা দরজা-জানলা বন্ধ করে দিলো অনন্যা। তার ভালো লাগছে না এত আলো। এত উজ্জ্বল আলো তার মনে ধাঁধা ধরিয়ে দিচ্ছে। ঘুলঘুলি আর এদিক-ওদিকের ফাঁক-ফোকর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে যেটুকু আলো আসছে, তাতে যে আলো-আঁধারি তৈরি হচ্ছে, অনন্যা সেটাই উপভোগ করছে। পাখাটা আস্তে আস্তে ঘুরছে। খুব মৃদু আর ঠান্ডা অনুভূতি কেমন যেন মেঘলা আমেজ ছড়িয়ে দিচ্ছে অনন্যার শরীরে, অনন্যার বন্ধ চোখে। অনন্যার ঘুম আসছে।

খাওয়ার পর অনেক গল্প আর গান শেষে জুতোয় পা গলাচ্ছে, চলে যাবে এখান থেকে, ঠিক সেই সময়েই দেখতে না পাওয়া অবস্থান থেকে হায়দার গেয়ে উঠল যে গানটা, শুনে অনন্যা থমকে গেল। আনমনা হয়ে গেল সে। ঝাপসা হয়ে গেল সবকিছু। সিলেটের অচেনা পথটা এঁকেবেঁকে এগিয়ে যাচ্ছে একটা নির্দিষ্ট বাড়ির দিকে। কাঁচা বাজার, জনবহুল রাস্তা, সওদায় ব্যস্ত নাগরিক, সাইকেল, গাড়ি—সবাইকে কাটিয়ে গাড়িটা একটা সাদা বাড়ির পেটের ভেতরে ঢুকে পড়ল। পোর্টিকোয় পৌঁছে থেমে গেল গাড়িটা। শুনশান চারদিক। অনন্যা জুতোয় পা গলাতে গলাতে গেয়ে উঠল—

এমনি বরষা ছিল সেদিন
শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন
তব হাতে ছিল অলস বীণ
মনে কি পড়ে প্রিয়।

গান শুনে হায়দার খুশি হল। কিন্তু অনন্যা থেমে যেতেই দূর থেকে একটু জোরেই হায়দার বলে উঠল, ‘বাকিটা গাও!’—

আমি শুধানু তোমায় বলো দেখি
কোনোদিন মোরে ভুলিবে কি
আঁখিপাতে বারি দুলিবে কি
আমার তরে প্রিয়।

হায়দারের গান শুনে এক মুহূর্ত থমকাল অনন্যা, ভাবল, হাসল, বলল, ‘আর না, দেরি হয়ে যাবে। পরে গাইব।’ দরজা খুলে এগিয়ে গেল লিফটের দিকে। পেছন পেছন বিনুআপা; লিফটের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘বাকিটা গাইলে না কেন? শুনতে চাচ্ছিল!’ অনন্যা হাসল। বলল, ‘বাকিটা তো মনে নেই। আমার কোনো গানই পুরোটা মনে থাকে না। সেদিনও দেখলে না কেমন ভুলে গেলাম। তোমরা একটু রেগেও গিয়েছিলে। আর…।’ ওদের নেমে আসার পাশাপাশি গানটাও যেন গড়াতে গড়াতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। লিফট ততক্ষণে একতলায় পৌঁছে গিয়ে নিজে থেকে দরজা খুলে অপেক্ষা করছে। অনন্যা একবার পেছন ফিরে দেখল। গুনগুন করে সুর তুলল গলায়—মনে কি পড়ে প্রিয়? মনে কি পড়ে প্রিয়? বিনুআপা অনন্যার পিঠে হাত দিয়ে চলতে চলতে বলল, ‘থাক, এখন আর মনে পড়ে কাম নাই। সময়ে করোটা কী!’ ‘তুমিও যেমন বিনুআপা! এ গান কি ভুলে যাবার? আমার মা গাইছে। শুনে শুনে আমরাও। আমি আর দিদি। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি। গান গাইতে গাইতে কেন যে আমার মায়ের চোখ জলে ভরে উঠছে, বুঝতে পারছি না। আঁচল হয়ে যাচ্ছে আলুথালু। মায়ের কান্না দেখে দিদিও কাঁদছে। আর আমি কাঁদার চেষ্টা করছি খুব। একটু একটু করে শিখছি, কিছু কিছু গানে কাঁদতে হয়। আর ওদিকে পশ্চিমা বৃষ্টি সাদা করে দিচ্ছে রাত। রাস্তার বাতিগুলো ভয় পাচ্ছে—নিভে যেতে কতক্ষণ!’ ‘এত যখন জানো, তখন গাইলে না কেন?’ গাড়ির দরজা বন্ধ করতে করতে অনন্যা বলল, ‘জানি কে বলল? বোঝার চেষ্টা করি মাত্র। আর, যখন-তখন এ গান গাইলে পাপ হয়, জানো না!’

সেই সাদা বাড়িটায় বোধহয় কেউই থাকে না; কেউই কোনোদিন থাকেনি। এমনই বিষণ্ণ তার অবয়ব। তেমনটাই মনে হয়েছিল অনন্যার। তাদের তো আসার কথা ছিল। গাড়ির আওয়াজেও কেউ এগিয়ে এল না দেখে একটু যেন হতাশই হল সবাই। হাতে সময় খুব কম। আজই ঢাকায় ফেরত যেতে হবে। প্রায় সাত-আট ঘণ্টার ধাক্কা। বিনুআপা সব সময়ে বলে, ‘যেটুকু পাচ্ছ, সেটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকবে। আমাকে দেখো না!’ অনন্যা চেষ্টা করে মানতে, পারে না। এই বাড়িটায় এমন একজন মানুষ থাকেন, যাকে নিয়ে গতকাল সন্ধেয় শিপুআপা অনেক ছবি এঁকেছিল। শুনে শুনে অনন্যাও মনে মনে সেই মানুষটির একটা ছবি এঁকেছিল। এখন শুধু অপেক্ষা মিলে যাবার। কিন্তু খুব কম মিলে যায়—মনের ছবি আর চোখের ছবি।

ঘুমিয়ে পড়ল অনন্যা। মাথার ওপর পাখাটা ঘুরেই চলেছে। ভাবল অনন্যা—কখন থামবে! হঠাৎ করে যদি বন্ধ হয়ে যায়, ক্ষতি কী? ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল সবাই। এই বাড়িটা পুরোনো একটা বাড়ি। সাদা রংটা ধূসর হয়ে গেছে। কাঠের দরজা জানলায় স্মৃতির কালচে ছোপ। বাঁ হাতে একটা সিঁড়ি। প্রয়োজন ছিল না, তবু অনন্যা বাঁ হাতটা তুলে ঘড়ি দেখল। অভ্যাস মানুষকে অনেক অপ্রয়োজনীয় কাজ করায়। তার জন্য যে অনন্যা আপশোস করে এমনটা নয়। আশপাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে ওরা ভাবল এই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেই হয়। কাউকে না কাউকে তো পাওয়া যাবে। ঠিক এমন সময়ই সেই মানুষটা নেমে এলেন। না, মিলল না। অনন্যা জানত। কিছু কিছু মিলল, কিন্তু তা অনন্যার কল্পনার থেকে অনেক আলাদা। আপ্যায়নের পালা, কতদিন পরে দেখার পালা শেষ হলে বিনুআপার পেছন পেছন অনন্যা ওপরে উঠে গেল। নিশ্চুপ, নিঃসঙ্গ একটা বারান্দা, সকালের মিঠে-কড়া রোদে ধুয়ে যাচ্ছে, সঙ্গে সুদৃশ ছাদ-বাগান, এখানে ওখানে সাজানো ভাস্কর্য, ছবি অনন্যাকে মোহময় করে তুলল। নিঃসঙ্গতাও যে এত সুন্দর হতে পারে আগে কখনো অনুভব করেনি অনন্যা। মুস্তাফা ঘরের ভেতর ঢুকে গেলেন, ‘এক মিনিট!’ বলে।

ঢং ঢং করে ঘণ্টা বেজে উঠল, খুব জোরে, সঙ্গে অনেক মানুষের চিৎকার। কারা যেন অনন্যাকে চেপে ধরেছে। অনন্যা ছাড়াতে চেষ্টা করছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। বিনুআপা না শিপুআপা, কোনজন অনন্যার নাম ধরে চেঁচিয়ে উঠল? অনন্যা ধাক্কা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে বসল। পাখাটা নিজে নিজেই কি বন্ধ হয়ে গেল? না। কিন্তু এত গরম কেন? গরমে, ঘামে অস্থির অনন্যা বালিশটাকে ছুড়ে ফেলে দিলো মাথার তলা থেকে। কাঁপছে সে। কোনো গান সে পুরো গাইতে পারে না। আলিবাহার টি এস্টেট। পাতাঝরা আকাশ ঢেকে দিচ্ছে একটা বাঁধানো পুকুরপাড়। বেজে উঠছে হারমোনিকা। তবু ঘরে ভ্রমর আসে না। একটা সিঁড়ি নেমে যাচ্ছে জলে এক পা এক পা করে। নিস্তব্ধ, নিঃসঙ্গ চা গাছের ছোটো ছোটো ছায়া তাকিয়ে দেখছে অনেকদিন পরে বেড়াতে আসা গুনগুন পোকাগুলোকে।

শুনল, ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। মীরপুরের রাস্তাটা একটু একটু করে যেন ভেসে ভেসে গড়িয়ে যাচ্ছিল বারিধারায়। বিদ্যুতের চমকে চম্‌কে উঠছিল বিনুআপার বারান্দা।–তাই কি বিরহ বরষাতে? আহা, তব হাতে ছিল অলস বীণ… মনে কি পড়ে? মনে কি পড়ে প্রিয়?

মোর হাতখানি ধরে কহিলে হায়
মন দিয়ে মন ভোলা কি যায়
কাঁদিবে আকাশ মোর ব্যথায়
বাদলও ঝরে প্রিয়।

ভোলা যায় বই কী! নইলে অনন্যা চলন্ত গাড়িতে বসে সবার দৃষ্টির আড়ালে এক টুকরো কাগজে নিজের ই-মেল আইডি আর ফোন নাম্বার লিখেছিল কেন? কেন সেটা চা-বাগানে মুস্তাফার হাতে না দিয়ে ধরে বসে রইল বাকি পথটা? মুস্তাফা যখন তাদের বিদায় জানিয়ে নেমে গেলেন গাড়ি থেকে, তখনো কেন বাড়িয়ে দিতে পারল না কাগজের টুকরোটা? অনন্যাকে যখন বললেন, ‘আরো আগে কেন দেখা হল না!’—তখনো কেন পারল না অনন্যা হাতটা বাড়িয়ে দিতে? ঢাকায় ফেরার পথে কেন কোনো নদীই আর অনন্যাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারল না? অনন্যা চলন্ত পাখার ব্লেডের দিকে চেয়ে গোনার চেষ্টা করল, কটা ব্লেড ঘুরছে। ব্লেডের ঘূর্ণনে বাইরের চুঁইয়ে পড়া আলো কেটে কেটে যাচ্ছে। না মুস্তাফা, না আলিবাহার টি এস্টেট, কোনোটাই পুনরায় সে দেখতে চায় না। স্মৃতিতে বেঁচে থাক হারমোনিকা, বেঁচে থাক পুকুরের সবজেটে জলে সিঁড়ির পদক্ষেপ, টিলার ধাপে ধাপে চা গাছের ছায়াময় দুপুর। চৈত্র-কাকের ডাককে চিরে বেরিয়ে গেল একটা বাসের ডাক। কাকটার ডাক ছটফট করে উঠে ডানা ঝাপটাল। আজ রাতে একটু বৃষ্টি হোক, কেমন?

হায় তুমি নাই বলে মোর সাথে
তাই কি বিরহ বরষাতে
এত বারিধারা আজি রাতে
অঝোরে ঝরে প্রিয়।

About The Author

admin

সংবাদের ব্যাপারে আমরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাস করি।বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনায়। আমাদের প্রত্যাশা একাত্তরের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশের পর্যায়ে।

Number of Entries : 7237

Leave a Comment

সম্পাদক : সুজন হালদার, প্রকাশক শিহাব বাহাদুর কতৃক ৭৪ কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। ফোনঃ 02-9669617 e-mail: info@visionnews24.com
Design & Developed by Dhaka CenterNIC IT Limited
Scroll to top