একাত্তর পরবর্তী কবিতা: স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের খন্ডচিত্র Reviewed by Momizat on .   বিশেষ প্রতিবেদক সমকালীন সময়ে সমস্ত বেদনাবোধ, বিক্ষোভ, উত্তাপ, সন্তাপকে ধারণ করে বাংলাদেশের কবিদের হাতে কবিতা প্রস্ফূটিত হয়ে উঠে নিজস্ব অনুভূতির চেতনায় শা   বিশেষ প্রতিবেদক সমকালীন সময়ে সমস্ত বেদনাবোধ, বিক্ষোভ, উত্তাপ, সন্তাপকে ধারণ করে বাংলাদেশের কবিদের হাতে কবিতা প্রস্ফূটিত হয়ে উঠে নিজস্ব অনুভূতির চেতনায় শা Rating: 0
You Are Here: Home » কালস্রোত » একাত্তর পরবর্তী কবিতা: স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের খন্ডচিত্র

একাত্তর পরবর্তী কবিতা: স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের খন্ডচিত্র

একাত্তর পরবর্তী কবিতা: স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের খন্ডচিত্র

 

বিশেষ প্রতিবেদক

সমকালীন সময়ে সমস্ত বেদনাবোধ, বিক্ষোভ, উত্তাপ, সন্তাপকে ধারণ করে বাংলাদেশের কবিদের হাতে কবিতা প্রস্ফূটিত হয়ে উঠে নিজস্ব অনুভূতির চেতনায় শানিত হয়ে। কবিদের লেখা পংক্তিমালায় তখনকার সময়ের মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা, নির্মম অত্যাচার, লুণ্ঠন, নির্যাতন ছাড়াও উঠে এসেছে মুক্তিযোদ্ধাদের রণযুদ্ধের গৌরবগাথা। স্বদেশ প্রেম তাদের কবিতার পংক্তিতে উচ্চারিত হয়েছে অসীম সাহসে ও মুক্তির চেতনায়। যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি শামসুর রাহমান বলে উঠেন-ঊনিশ’শো একাত্তরের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি ছবি দেখেছিলাম পত্রিকায় রাস্তার ধারে একজন গুলিবিদ্ধ মানুষ নিজের রক্ত দিয়ে লিখছেন শ্লোগান তার দেশের স্বপক্ষে, দেশবাসীর স্বপক্ষে। সেদিন গুলিবিদ্ধ মানুষটিকে স্বাধীনতার নকীব বলে মনে হয়েছিলো আমার। এই ছবি উজ্জ্বল হয়ে ফিরে আসে আমার কাছে। এই একাত্তুরের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমার গ্রাম পাড়াতলিতে এক দুপুরে পুকুর পাড়ে বসে লিখে ফেললাম। ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতা দুটি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লেখা চেতনা জাগানিয়া কবিতাগুলো প্রকাশের প্রয়োজন দেখা দিলেও কবির জীবন বিপন্ন হতে পারে এই ভাবনা, ও দ্বিধার থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখালেন মূলত উর্দুভাষী বাঙালি লেখক, সমালোচক, বুদ্ধিজীবী আবু সায়ীদ আইয়ুব। তিনি কবির ছদ্মনামে (মজলুম আবিদ)কবিতাগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা করলেন এবং কবিতাগুলো দিয়ে বন্দী শিবির থেকে কাব্য গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ ১৯৭২ সালে পুনেন্দু পত্রীর প্রচ্ছদে অর্চনা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়।

যেমন-স্বাধীনতা তুমি

কবি মাহবুব সাদিকের যুদ্ধভাসান, আবু কায়সারের জার্নাল ৭১, হুমায়ূন কাবিরের ‘লাল বলের মত গ্রেনেট’ আলতাফ হোসেনের’ অষ্টগ্রামে সমবেত মুক্তিযোদ্ধা ও জনতা’, অসীম সাহার ন্যায়যুদ্ধ, আসাদ চৌধুরীর রিপোর্ট ৭১, ফজল শাহাবুদ্দীনের এপ্রিলের একটি দিন, সিকদার আমিনুল হকের নেকড়ের মুখে, দিলওয়ারের যুদ্ধ যখন মানবতার পরিত্রাণ, বেলাল চৌধুরীর স্বদেশভূমি, হাসান হাফিজুর রহমানের তোমার আপন পতাকা, রফিক আজাদের নেবে স্বাধীনতা, আবিদ আজাদের এখন যে কবিতাটি লিখব আমি, রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর বাতাসে লাশের গন্ধ, অন্যতম দ্রোহের কবিতা।

স্বদেশ, সমাজ, স্বকাল ও প্রবাহমান রাজনীতির বিশ্বস্ত চালচিত্র, ব্যক্তি মানুষের নানান জাগতিক চেতনা সার্থকরূপে ফুটে উঠেছে কবিতায়। মুক্তি সংগ্রামের সংকটময় সময়ে মুক্তিকামী বাঙালির মনে যে প্রেরণা, উদ্দীপনা জুগিয়েছে। তাইতো মুক্তির পক্ষের সাহসী সৈনিক তিনি। মুক্তিযুদ্ধ ও জনতার অক্লান্ত সংগ্রাম, শোষণ ও নিপীড়নের প্রতিবাদী উচ্চারণ মুক্তিকামী স্বাধীনতা পিয়াসী মানুষের স্বপ্ন, সাধ ও যুদ্ধ- পরবর্তী মানবিক বোধের উচ্চারণ ধংসস্তূপের মধ্য ফেলার আনন্দ-বেদনা, স্বজন হারানো বেদনা ও হতাশার উচ্চারণ কবিদের কবিতায় উঠে এসেছে নানান অক্ষরে। যুদ্ধ-পরবর্তী দেশের স্বজন হারানোর আর্তনাদ, রাজনৈতিক অবস্থান ও পাওয়া না পাওয়ার বেদনা,হতাশা কবিকে করেছে ব্যথিত। তাইতো কবি আবুল হোসেন উচ্চারণগুলো শোকের কবিতায় স্বাধীনতা পরবর্তী স্বজন হারানোর বেদনার কথা উচ্চারণ করেছেন এভাবে

‘অনেক যুদ্ধ গেলো

অনেক রক্ত গেলো

শিমুল তুলোর মতোন সোনা-রুপা ছড়ালো বাতাস

ছোট ভাইটিকে আমি

কোথাও দেখিনা

নরম নোলক পরা বোনটিকে

আজ আর কোথাও দেখিনা

কেবল পতাকা দেখি

কেবল উৎসব দেখি

স্বাধীনতা দেখিনা।

কবি নির্মলেন্দু গুণ বাংলা কবিতায় নিজের প্রেমিক চেতনায় স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করেছেন বিপ্লবীর চোখে। তারুণ্যের উদ্দীপনায় স্বাধীনতার জন্য অনিঃশেষ ভালোবাসায় লিখেছেন হুলিয়া নামক অসামান্য কবিতাটি। কবিতার মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ সূচনা হওয়ার অব্যবহিত পূর্বের প্রেক্ষাপট। বাংলার ভবিষ্যৎ, স্বাধীনতার কথা, চেতনার দিনগুলোতে যুদ্ধোত্তরকালে রচিত হয়েছে একগুচ্ছ কবিতা। যে কবিতা শরীর ও মনে উচ্চারিত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা যেমন-

‘ওরা প্র্রত্যেককে জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর

আমাদের ভবিষ্যৎ কি?

আইয়ুব খান এখন কোথায়?

শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?

আমার নামে কতদিন আর এ রকম হুলিয়া ঝুলবে?

আমি কিছুই বলবো না, আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকা

সারি সারি চোখের ভেতরে

বাংলার বিভিন্ন ভবিষ্যৎকে চেয়ে দেখবো’।

১৯৭১ সালে শত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পূর্ব বাংলা পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান নামধারী বাঙালি অধ্যুষিত ভূখণ্ডের মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানী

শাসকদের দ্বারা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সর্বোপরী মানবিক জীবনযাপনের নানারকম বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়। ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাঙালির স্বাধীনতা ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশ ও বাঙালিদের আত্মত্যাগের চিত্র কবিদের করেছে ব্যথিত ও চেতনায় জেগেছে স্বদেশের মমতা। তাদের লেখায় আবেগময়ী চেতনাবাহী কবিতা, স্বপ্নভূমির নতুন করে জেগে এ ছাড়াও নতুন জাতির জাগরণের স্বাক্ষরে কবিতায় তুলে এনেছেন তাদের নতুন শব্দাবলির নির্মাণে। সকল কবির কবিতায় আবহমান বাংলার আত্ম-পরিচয়ের অভিজ্ঞান ঐতিহ্যের সংগ্রামের করুণ চিত্রাবলী, হত্যা নির্যাতনের চিত্রাবলীর স্বরূপ।

যে সকল কবির কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ সক্রিয় হয়ে উঠেছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম কবি জসিম উদ্দীন, সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব, হুমায়ুন কবির, সিকান্দার আবু জাফর,আবুল হোসেন, শামসুর রাহমান, দিলওয়ার, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আল মাহমুদ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, হাসান হাফিজুর রহমান, মাহবুবুল আলম চৌধুরী,সৈয়দ সামসুল হক, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, সিকদার আমিনুল হক, আহমদ ছফা, ফজল শাহাবুদ্দিন, মোহাম্মদ মাহফুজ উল্যাহ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, ওমর আলী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ,আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুন, রবিউল হুসাইন, মহাদেব সাহা, রফিক আজাদ, মুহাম্মদ নুরুল হুদা,আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, জিয়া হায়দার, ময়ূখ চৌধুরী, মাহবুব সাদিক, শামসুল ইসলাম, শিহাব সরকার, অসীমসাহা, রবীন্দ্র গোপ, হেলাল হাফিজ, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, আবুল হাসান, ত্রিবিদ দস্তিদার, মিনার মনসুর, নাসির আহমেদ, রুবী রহমান, জুবাইদা গুলশান আরা, আনওয়ার আহমেদ প্রমুখ। অনেক কবির কবিতায় বাঙালি চেতনার সমস্ত অবয়ব,প্রকাশ পেয়েছে যেমনিভাবে তেমনিভাবে বাংলাদেশের কবিতার অবিতায় বাঙলি চেতনার সমস্ত অবয়ব, প্রকাশ পেয়েছে যেমনিভাবে তেমনিভাবে বাংলাদেশের কবিতার অন্তর জুড়ে সঞ্চারিত হয়েছে তেমনিভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে নানান অনুসঙ্গ রূপ পেয়েছে কবিতায়। কবিতার শরীর ও ধমনীতে সঞ্চারিত হয়েছে তীব্রতা, ক্ষোভ, আর্তি ও বেদনার স্বপ্ন গাঁথা। তেমনিভাবে কবি রফিক আজাদ তুলে এনেছেন বাঙালির মুক্তি চেতনা, মার্চের ছাব্বিশ, প্রিয়তম নারীর আর্তি ও মানবিক আহ্বান। যেমন:

‘নেবে স্বাধীনতা নাও, তোমাকে দিলাম

নাও, তোমার দু’হাতে তুলে দিচ্ছি

পঞ্চাশ হাজার বর্গমাইলের ভিতরে যা কিছু

এদেশ স্বাধীন করেছি আমি, আমার দু’হাত

এ আমার একমাত্র অহংকার।

 


About The Author

admin

সংবাদের ব্যাপারে আমরা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাস করি।বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের সুমহান চেতনায়। আমাদের প্রত্যাশা একাত্তরের চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক সুখী সমৃদ্ধশালী উন্নত দেশের পর্যায়ে।

Number of Entries : 7530

Leave a Comment

সম্পাদক : সুজন হালদার, প্রকাশক শিহাব বাহাদুর কতৃক ৭৪ কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স, ২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত। ফোনঃ 02-9669617 e-mail: info@visionnews24.com
Design & Developed by Dhaka CenterNIC IT Limited
Scroll to top